"আমরা দুটি ভাই, শিবের গাজন গাই"
সেই ছোটবেলায় পড়েছি, তবু মনে আছে এখনও। সেই মনে থাকার থেকেই খোঁজ শুরু গাজনের।
শুনেছিলাম পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় শিবের গাজন হয়, তবে কোথাও গিয়ে দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি কখনো। তাই এবছর আগে থেকেই খোঁজ করছিলাম কোথায় গিয়ে প্রত্যক্ষ করা যায় এই সুপ্রাচীন উৎসব। খোঁজ পাওয়া গেল বাড়ির কাছেই হালিসহরের বিজনা গ্রামে অনেক দিনের পুরোনো চড়ক পূজো হয়। ওই লালন গানে বলে না-
"হাতের কাছে হয় না খবর,
কি দেখতে যাও দিল্লী-লাহোর?"
তাই এবার হাতের কাছেই গাজন দেখতে বেরিয়ে পরলাম।
সেই ছোটবেলায় পড়েছি, তবু মনে আছে এখনও। সেই মনে থাকার থেকেই খোঁজ শুরু গাজনের।
শুনেছিলাম পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় শিবের গাজন হয়, তবে কোথাও গিয়ে দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি কখনো। তাই এবছর আগে থেকেই খোঁজ করছিলাম কোথায় গিয়ে প্রত্যক্ষ করা যায় এই সুপ্রাচীন উৎসব। খোঁজ পাওয়া গেল বাড়ির কাছেই হালিসহরের বিজনা গ্রামে অনেক দিনের পুরোনো চড়ক পূজো হয়। ওই লালন গানে বলে না-
"হাতের কাছে হয় না খবর,
কি দেখতে যাও দিল্লী-লাহোর?"
তাই এবার হাতের কাছেই গাজন দেখতে বেরিয়ে পরলাম।
চড়ক বা শিবের গাজন বা নীল পূজা এক এক জায়গায় এক এক নাম এই অনুষ্ঠানের। আবার এই একই পূজার নাম মালদহে 'গম্ভীরা' বা দিনাজপুরে 'গমীরা'। ইতিহাস খুঁজলেও এই চড়কের শুরু সম্বন্ধে কোনো সঠিক ধারনা পাওয়া যায় না। তবুও এটা জানা যায় যে শিবের গাজনের উৎপত্তি ধর্মঠাকুরের গাজন থেকে। কথিত আছে যে এই শিবের গাজন সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা প্রথম শুরু করেন ১৪৮৫ খ্রীষ্টাব্দে। এই গাজনের প্রচলন বিশেষত অন্তজ শ্রেণীর মধ্যেই বেশি দেখা যেত। যদিও তা নিয়ে একটা কিংবদন্তী আছে। এই কিংবদন্তী হলো অনিরুদ্ধ আর ঊষার প্রেমের কাহিনী। অনিরুদ্ধ হলো শ্রী কৃষ্ণের নাতি। কথিত আছে যে এক দিন ঊষার সাথে দেখা করতে এসে অনিরুদ্ধ ধরা পরে যায় হরিবংশের রাজা বাণরাজার কাছে। বাণরাজা ক্রুদ্ধ হয়ে অনিরুদ্ধ কে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে খবর কৃষ্ণের কাছে পৌঁছায় ও কৃষ্ণ তার আগেই সেখানে পৌঁছে সুদর্শন চক্র দিয়ে বাণরাজার হাত কেটে দেয়। বাণরাজ ছিলেন শিবের উপাসক। তিনি শ্রী কৃষ্ণ দ্বারা প্রতিহত হয়ে রক্তাত্ব ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় শিবের কাছে এসে নৃত্য করেন। তাতে শিব খুশী হয়ে বাণকে বর প্রদান করেন, সেই বর অনুযায়ী যদি কোনো শিব ভক্ত বাণের মত শোণিতাপ্লুত কলেবরে ভক্তি নিয়ে, সত্য পরায়ণ হয়ে ও সরলতার সাথে শিবের সামনে নৃত্য পরিবেশন করে তবে সেই ভক্ত শিবের পুত্রত্ব লাভ করবে। এর থেকেই শিবের গাজনের সাথে বাণরাজার নাম অনুযায়ী 'বাণ ফোঁড়া' কথাটি জড়িয়ে। তাই এই গাজনের সময় শিব ভক্ত 'সন্ন্যাসী' রা নিজেদের শরীরে বাণ দিয়ে ছেদ করেন ও শিবের সামনে নৃত্য করেন। তবে এখন এই চরকের আচারে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। মূল নিয়মাবলী মোটামোটি ঠিক রেখে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম ভাবে পালন করা হয় এই উৎসব।
বলা হয় যে শিব সাধনার শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো শিবের গাজন। সাধারণত গ্রামে একজন 'মূল সন্ন্যাসী' থাকেন যে বাকিদের পরিচালনা করেন। গ্রামের যে কেউ সন্ন্যাস নিতে পারেন। তবে সন্ন্যাস নেওয়ার জন্যে এক মাস উপবাস, ফলাহার, হবিষ্যির মতো কঠিন নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তবে কালের গতিতে আজ এই নিয়ম অনেকটাই শিথিল। এখন শুধুমাত্র একমাস বা এক সপ্তাহ নিরামিষ আহারের মাধ্যমে সন্ন্যাস পালন হয়। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নীল পূজা হয়। মনে করা হয় যে নীল পূজার দিন শিব-পার্বতীর বিয়ে হয়। তার পরের দিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিন পালন হয় শিবের গাজন। সকাল থেকে শুরু হয় বিভিন্ন প্রকারের আচার অনুষ্ঠান। গ্রামের লোকেরা এক এক রকম সেজে দূর্গা পালা, কালী পালার মত নানা রকম পালা করে নাচেন। সন্যাসীরা কাটায় ঝাঁপ দেন, আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটেন, পিঠে বা গালে বান ফোঁড়েন। সাধারণত চড়ক গাছ নামে একটা বিশেষ গাছ থাকে প্রতিটি গ্রামে। এই চড়ক গাছটি সারা বছর গ্রামের মধ্যের কোনো এক পুকুরে ডোবানো থাকে। গাজনের দিন এই গাছকে সেখান থেকে তুলে এনে মাটিতে স্থাপন করা হয়। গাছটি এখানে শিবের প্রতীক ও ভূমি হলো পার্বতীর প্রতীক। তাই এই শিবের গাজন এক রকম শিব আর পার্বতীর মিলনের উৎসব। অনেকে এই শিবের গাজন উৎসবকে 'fertility cult' হিসাবেও মনে করেছেন। যা অনেক কৃষকেরা পালন করেন নিজেদের জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্যে। সন্ন্যাসীদের মধ্যে বিশেষ কেউ কেউ নিজের পিঠে হুক লাগিয়ে এই চড়ক গাছের সাথে দড়ি লাগিয়ে ঘোরেন। এখন যদিও এই নিয়ম গুলো এক প্রকার entertainment এ পরিণত হয়েছে। এখন এক প্রকার বিশেষ দল ভাড়া করা যায় যারা কেবলমাত্র বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে বানফোঁড়া, বড়শিফোঁড়া, কাঁটায় ঝাঁপের মত আচার গুলো করেন। বস্তুতঃ পিঠে বান ফোঁড়া, কাটায় ঝাঁপ দেওয়া, পিঠে হুক লাগিয়ে চড়ক গাছে ঘোরা এই গুলো এক এক রকমের কষ্টসাধন প্রক্রিয়া। এই গুলোর মাধ্যমে দেবতাকে তুষ্ট করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই সবের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের সুস্বাস্থ ও মঙ্গল প্রাপ্তি হয়।
তথ্যঃ
১. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Charak_Puja
২. http://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/sadamonarmanus/29578990
৩. "গাজন"- মনোজিৎ অধিকারী।











দারুন... দারুন...
ReplyDelete