রথের দিন সকালে ঘুম ভাঙলো, ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে ন'টা। তাড়াতাড়ি উঠলাম কারণ সাড়ে দশটা'র কল্যাণী সুপার ধরার কথা। গন্তব্য ধর্মতলা মেট্রোগলি। ক্যামেরা আর লেন্স সারাতে দেওয়া আছে, আজ আনার কথা। সব সেরে রেল স্টেশনে যখন পৌঁছালাম ঘড়ি বলছে ট্রেনের সময় পার হয়ে গেছে। তা বললে কি হবে, আমাদের লাইনের ট্রেন কোনো দিনও সময়ে আসে না, আজও তার ব্যতিক্রম হল না। তাই কল্যাণী সুপারই পেলাম। সাথে জয় দা। দোকান থেকে ক্যামেরা নিয়ে যখন বেরোলাম তখন প্রায় একটা বাজে। ঠিক হলো যাওয়া হবে মাহেশের রথ দেখতে শ্রীরামপুর। মেট্রো ধরে দমদম, সেখান থেকে ট্রেনে ব্যারাকপুর, তারপর অটো করে ধবী ঘাট। ঘাটে এসে দেখলাম নদীর জল আর আকাশ মিলে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। যেন প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসের ওপর চিত্রকরের তাক লাগানো সৃষ্টি। এ সৃষ্টি পার্থিব নয়, স্বর্গীয়। কতো লোক আমার সাথে চলছে, যদিও তাদের সাথে লৌকিক পরিচিতি নেই, ওদের গন্তব্য জানা নেই, তবুও সবার সাথে আমার যেন এক নিবিড় সম্পর্ক। আর এই সম্পর্কে আমাকে বেঁধেছে এই প্রকৃতিই। প্রকৃতি কোনো ভেদ মানে না - না মানে উঁচু-নিচু'র ভেদ, না মানে বড়-ছোট'র ভেদ। তেমনই হয়তো আমার আর বাকিদের মধ্যেও কোনো এক সাধারণ জায়গা প্রকৃতিই তৈরি করেছে, যার মধ্যে না আছে কোনো ভেদ, না আছে কোনো বিচ্ছেদ।
ঘাটে নৌকা ঠেকার সাথে সাথেই মনের চিন্তাও ঠেক খেলো। নামলাম বাংলার প্রাচীনতম শহরগুলোর মধ্যে একটায়, শ্রীরামপুরে। টোটো স্ট্যান্ডে এসে শুনলাম বিপদ, যদিও বন্ধু আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়েছিল, আজ মাহেশ পর্যন্ত গাড়ি যাচ্ছে না, তাই কিছুটা গাড়িতে গিয়ে বাকি পথ হেঁটেই পৌঁছাতে হবে। তবে তাই হোক। টোটো করে গলির ভেতর দিয়ে চলছি, ছাড়িয়ে চলেছি কত পুরোনো বাড়ি। বাড়িগুলো হয়তো কত ইতিহাসের সাক্ষী, কত ভাঙা-গড়ার সাক্ষী। কত বছরের পুরনো জানা নেই, হয়তো বাড়ির দেওয়ালের থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইটও সেই হিসাব ভুলেছে। টোটো থামতে না থামতে ৫-১০ জন কচি কাঁচা ছুটে আসলো গাড়ির দিকে। ভাবলাম হয়তো চাঁদা দেওয়ার ব্যাপার হবে কিছু, আসলে শহুরে মন তো তাই সোজা কিছু ভাবতে একটু অসুবিধা হয়। সবকিছুই যেন একটু বাঁকা নজরে দেখার অভ্যাস। ওরা এসেছে পরিশ্রান্ত পথিকদের জল আর বাতাসা দিতে, ক্লান্তি দূর করতে। খুব বেশি পরিশ্রান্ত না হলেও জল আর বাতাসা খেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। দিক নির্ধারণ করতে অসুবিধা হলো না, শুধু ভীড়ের গতিপথ লক্ষ করে এগিয়েই পৌঁছে গেলাম বড় রাস্তাতে। বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম দু'দিকে সার দিয়ে পসরা সাজিয়ে দোকানীরা। সব মেলাতেই যেন একই রকমের এই মুখগুলো। আমরা আসি মেলা দেখতে, আর ওরা আসে আমাদের দেখতে। মানে, যদি আমাদের কিছু কেনার ইচ্ছা হয় ওদের থেকে সেই আশাতেই চেয়ে থাকে আমাদের দিকে। চলতে চলতে সামনে দেখি বিরাট এক রথ, তার সামনে ভক্তরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। যদিও এপথ আমার নয়, তবুও ভক্তদের ভিড় ঠেলে যতটা সম্ভব সামনের দিকে এগোলাম রথ দেখতে। দেখলাম জগন্নাথদেবকে লেপ দিয়ে মুড়ে দড়ি দিয়ে রথের ওপরে তোলা হচ্ছে।
মাহেশের রথযাত্রা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার প্রাচীনতম ও বৃহত্তম রথযাত্রা। কিংবদন্তী বলছে চতুর্দশ শতাব্দীতে দুর্বানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক ব্যক্তি পুরীতে যান তীর্থ করতে। নিজে হাতে জগন্নাথদেবকে ভোগ খাওয়ানোর তাঁর মনোবাসনা ছিল, কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ তাতে বাঁধা দেন। মনের দুঃখে দুর্বানন্দ অনশন করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন বলে ঠিক করেন। অনশনের তৃতীয় দিনে দুর্বানন্দ স্বপ্নাদেশ পান বাংলাতে ফিরে গিয়ে হুগলী নদীর ধারে মাহেশ বলে একটা জায়গায় জগন্নাথ মন্দির স্থাপন করার। আদেশে এও বলা হয় যে ঠিক সময় মত নদীতে ভেসে আসা এক নিম কাঠ পাবেন দুর্বানন্দ, সেই কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রা'র মুর্তি বানিয়ে নিজে হাতে তাঁদের ভোগ খাওয়াবেন। দুর্বানন্দ তাই করেন। সেই থেকে মাহেশে জগন্নাথ মন্দির। এও বলা হয় যে সন্ন্যাস নেওয়ার পর নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে মহাপ্রভু মাহেশে এসেছিলেন। মাহেশের জগন্নাথ মন্দির দেখে তিনি মুগ্ধ হন ও এই মন্দিরের নামকরণ করেন "নব-নীলাচল"। পরবর্তীকালে দুর্বানন্দের অনুরোধে শ্রীচৈতন্য তাঁর ঘনিষ্ঠ পর্ষদ কমলাকর পিপলাইকে এই মন্দিরের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। তিনিই এই মন্দিরের দেখাশুনা করেন।
কিন্তু এখন না আছে সেই পুরনো মন্দির, না আছে সেই পুরনো রথ। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৫৫ সালে তৈরী করেন কলকাতার নারায়ণ চন্দ্র মল্লিক নামে এক ভক্ত। বর্তমান রথটি ১৮৮৫ সালে কৃষ্ণরাম বসু নামে এক ভক্ত Martin Burn Company -কে দিয়ে তৈরি করান। রথটি বাংলার নবরত্ন মন্দিরের আদলে তৈরী। উচ্চতায় ৫০ ফুট এবং ওজনে ১২৫ টন। মোট ১২ টা চাকার ওপর দাঁড় করানো।
কাঁসর বাজার সাথে সাথে শুরু হলো রথযাত্রা। ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হল প্রভুর। আমরা ততক্ষনে ভিড় পেরিয়ে এক বাড়ীর ছাদের ওপর। আমার পেছন দিকে হুগলী বইছে, সামনের দিকে দিনের শেষে দিবাকর বিদায় নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একসাথে জগন্নাথের যাত্রা দেখছেন না সূর্যাস্ত দেখছেন জানা নেই।
তথ্যঃ
১. http://rathyatralive.com/mahesh-rath-yatra-in-serampore-west-bangal/123/
২. https://www.travelmyglobe.com/Destination.aspx?LinkId=63142&IsRest=False
৩. https://rangandatta.wordpress.com/2012/06/20/mahesh-rath-yatra/
৪. https://en.wikipedia.org/wiki/Rathayatra_of_Mahesh
৫. http://serampore.eziassist.com/about/mahesh-rath-yatra-second-oldest-in-india-after-puri
৬. http://double-dolphin.blogspot.com/2014/12/the-jagannath-temple-of-mahesh-serampore.html
![]() |
| রথযাত্রা উপলক্ষে প্রকৃতির সাজ |
ঘাটে নৌকা ঠেকার সাথে সাথেই মনের চিন্তাও ঠেক খেলো। নামলাম বাংলার প্রাচীনতম শহরগুলোর মধ্যে একটায়, শ্রীরামপুরে। টোটো স্ট্যান্ডে এসে শুনলাম বিপদ, যদিও বন্ধু আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়েছিল, আজ মাহেশ পর্যন্ত গাড়ি যাচ্ছে না, তাই কিছুটা গাড়িতে গিয়ে বাকি পথ হেঁটেই পৌঁছাতে হবে। তবে তাই হোক। টোটো করে গলির ভেতর দিয়ে চলছি, ছাড়িয়ে চলেছি কত পুরোনো বাড়ি। বাড়িগুলো হয়তো কত ইতিহাসের সাক্ষী, কত ভাঙা-গড়ার সাক্ষী। কত বছরের পুরনো জানা নেই, হয়তো বাড়ির দেওয়ালের থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইটও সেই হিসাব ভুলেছে। টোটো থামতে না থামতে ৫-১০ জন কচি কাঁচা ছুটে আসলো গাড়ির দিকে। ভাবলাম হয়তো চাঁদা দেওয়ার ব্যাপার হবে কিছু, আসলে শহুরে মন তো তাই সোজা কিছু ভাবতে একটু অসুবিধা হয়। সবকিছুই যেন একটু বাঁকা নজরে দেখার অভ্যাস। ওরা এসেছে পরিশ্রান্ত পথিকদের জল আর বাতাসা দিতে, ক্লান্তি দূর করতে। খুব বেশি পরিশ্রান্ত না হলেও জল আর বাতাসা খেয়ে হাঁটা শুরু করলাম। দিক নির্ধারণ করতে অসুবিধা হলো না, শুধু ভীড়ের গতিপথ লক্ষ করে এগিয়েই পৌঁছে গেলাম বড় রাস্তাতে। বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম দু'দিকে সার দিয়ে পসরা সাজিয়ে দোকানীরা। সব মেলাতেই যেন একই রকমের এই মুখগুলো। আমরা আসি মেলা দেখতে, আর ওরা আসে আমাদের দেখতে। মানে, যদি আমাদের কিছু কেনার ইচ্ছা হয় ওদের থেকে সেই আশাতেই চেয়ে থাকে আমাদের দিকে। চলতে চলতে সামনে দেখি বিরাট এক রথ, তার সামনে ভক্তরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। যদিও এপথ আমার নয়, তবুও ভক্তদের ভিড় ঠেলে যতটা সম্ভব সামনের দিকে এগোলাম রথ দেখতে। দেখলাম জগন্নাথদেবকে লেপ দিয়ে মুড়ে দড়ি দিয়ে রথের ওপরে তোলা হচ্ছে।
![]() |
| জগন্নাথকে রথে তোলা হচ্ছে |
মাহেশের রথযাত্রা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং বাংলার প্রাচীনতম ও বৃহত্তম রথযাত্রা। কিংবদন্তী বলছে চতুর্দশ শতাব্দীতে দুর্বানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক ব্যক্তি পুরীতে যান তীর্থ করতে। নিজে হাতে জগন্নাথদেবকে ভোগ খাওয়ানোর তাঁর মনোবাসনা ছিল, কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ তাতে বাঁধা দেন। মনের দুঃখে দুর্বানন্দ অনশন করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন বলে ঠিক করেন। অনশনের তৃতীয় দিনে দুর্বানন্দ স্বপ্নাদেশ পান বাংলাতে ফিরে গিয়ে হুগলী নদীর ধারে মাহেশ বলে একটা জায়গায় জগন্নাথ মন্দির স্থাপন করার। আদেশে এও বলা হয় যে ঠিক সময় মত নদীতে ভেসে আসা এক নিম কাঠ পাবেন দুর্বানন্দ, সেই কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রা'র মুর্তি বানিয়ে নিজে হাতে তাঁদের ভোগ খাওয়াবেন। দুর্বানন্দ তাই করেন। সেই থেকে মাহেশে জগন্নাথ মন্দির। এও বলা হয় যে সন্ন্যাস নেওয়ার পর নবদ্বীপ থেকে পুরী যাওয়ার পথে মহাপ্রভু মাহেশে এসেছিলেন। মাহেশের জগন্নাথ মন্দির দেখে তিনি মুগ্ধ হন ও এই মন্দিরের নামকরণ করেন "নব-নীলাচল"। পরবর্তীকালে দুর্বানন্দের অনুরোধে শ্রীচৈতন্য তাঁর ঘনিষ্ঠ পর্ষদ কমলাকর পিপলাইকে এই মন্দিরের দায়িত্বে নিয়োগ করেন। তিনিই এই মন্দিরের দেখাশুনা করেন।
![]() |
| ভক্তদের রশির টান |
কিন্তু এখন না আছে সেই পুরনো মন্দির, না আছে সেই পুরনো রথ। বর্তমান মন্দিরটি ১৭৫৫ সালে তৈরী করেন কলকাতার নারায়ণ চন্দ্র মল্লিক নামে এক ভক্ত। বর্তমান রথটি ১৮৮৫ সালে কৃষ্ণরাম বসু নামে এক ভক্ত Martin Burn Company -কে দিয়ে তৈরি করান। রথটি বাংলার নবরত্ন মন্দিরের আদলে তৈরী। উচ্চতায় ৫০ ফুট এবং ওজনে ১২৫ টন। মোট ১২ টা চাকার ওপর দাঁড় করানো।
![]() |
| ক্ষুদেদের রথ |
কাঁসর বাজার সাথে সাথে শুরু হলো রথযাত্রা। ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হল প্রভুর। আমরা ততক্ষনে ভিড় পেরিয়ে এক বাড়ীর ছাদের ওপর। আমার পেছন দিকে হুগলী বইছে, সামনের দিকে দিনের শেষে দিবাকর বিদায় নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একসাথে জগন্নাথের যাত্রা দেখছেন না সূর্যাস্ত দেখছেন জানা নেই।
তথ্যঃ
১. http://rathyatralive.com/mahesh-rath-yatra-in-serampore-west-bangal/123/
২. https://www.travelmyglobe.com/Destination.aspx?LinkId=63142&IsRest=False
৩. https://rangandatta.wordpress.com/2012/06/20/mahesh-rath-yatra/
৪. https://en.wikipedia.org/wiki/Rathayatra_of_Mahesh
৫. http://serampore.eziassist.com/about/mahesh-rath-yatra-second-oldest-in-india-after-puri
৬. http://double-dolphin.blogspot.com/2014/12/the-jagannath-temple-of-mahesh-serampore.html









No comments:
Post a Comment