শনিবার সকাল, প্ল্যান অনুযায়ী হালিসহর স্টেশন থেকে সকাল ৮:৪৩ এর ডাউন গেদে লোকাল। নৈহাটী থেকে ৯:০৭ এর শিয়ালদা-কাটোয়া লোকাল। গন্তব্য অগ্রদ্বীপ, বর্ধমান জেলার এক গ্রাম। সেখানে এক মেলা দেখতে যাওয়া। সাথে আমার দোস্ত, সাগর। বারবার দেখেছি ট্রেন যতই মফরসল ছেড়ে গ্রামের দিকে ঢোকে ততই মন কেমন যেন শীতল হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম না। দুপাশে সবুজ খেত, মাটির বাড়ী আর সাথে সাথে মানুষও যেন পাল্টে যাচ্ছে। এই লাইনের ষ্টেশনগুলোর নাম দেখেই ঠাওর করা যায় এখনকার মানুষ খুব ভক্তপ্রাণ। দেখলামও তাই, প্রায় সবার গলায় তুলসী কাঠ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষের মালা। পুরুষ আর প্রকৃতি দেখতে দেখতে ঘন্টা দুয়েকের কাছাকাছি কেটে গেল। অবশেষে অগ্রদ্বীপ স্টেশনে নামলাম। মেলার নাম "অগ্রদ্বীপের মেলা" হলেও, অগ্রদ্বীপ রেল স্টেশন থেকে মেলা পর্যন্ত পৌঁছাতে ভালো বেগ পেতে হল। স্টেশন থেকে মিনিট দশেক হেঁটে ভটভটি আর অটোর স্ট্যান্ড। অসংখ্য লোক। কেউ যাচ্ছে আবার কেউ ফিরছে মেলা দেখে। লাল-সবুজ-গেরুয়া সব পার্টি থেকে "দর্শনার্থী ও পূর্ণারথীদের উদ্দেশ্যে" নানা নির্দেশ ও সতর্কবাণী। একটা ভটভটিতে চেপে পরলাম আমরা। সে যেন এক আলাদা যাত্রা। যেন নিক্কো পার্কের রোলার কোস্টের। এত ভটভটির ধোঁয়াতে চার দিক অন্ধকার। মিনিট পনের রাইড চরার নামালো গঙ্গার পশ্চিম পারে। সেখান থেকে নৌকা পার হয়ে অগ্রদ্বীপ মেলা। লাইন দিয়ে নৌকাতে উঠে পুব ঘাটে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে পৌছালাম মেলা চত্বরে।
রাস্তার দুদিকে বড় বড় প্যান্ডেলে না না মতের ভক্তদের সমাবেশ। কেন অগ্রদ্বীপ, কিসেরই বা মেলা? সেটা জানতে হলে বেশ কিছু বছর অতীতে যেতে হবে।
কথিত আছে যে,
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর একজন সহচর ছিলেন গোবিন্দ ঘোষ। একবার মহাপ্রভু তাঁর কয়েকজন সাথীদের নিয়ে বৃন্দাবন যাওয়ার সময় পথে এক গৃহস্থের বাড়িতে দুপুরে খাবার খান। খাবার শেষে তিনি কিছু মুখশুদ্ধি চাইলে গৃহ কর্তা হরিতকি দেন। গোবিন্দ ঘোষ সেই হরিতকির টুকরো করে কিছুটা মহাপ্রভুকে দেন ও বাকিটা পরের দিন মহাপ্রভুর জন্যে রেখে দেন। পরের দিন মহাপ্রভু মুখশুদ্ধি চাইলে গোবিন্দ আগের দিনের সঞ্চিত হরিতকি দেন। এই সঞ্চিত করা দেখে মহাপ্রভু গোবিন্দকে গৃহী জীবন যাপনের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বর সেবার নির্দেশ দেন। গোবিন্দ ঘোষ এই অগ্রদ্বীপেই নিজের ঘর করেন ও গোপীনাথ বিগ্রহ স্থাপন করেন। কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু সন্তান জন্ম দিয়ে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। গোবিন্দ নিজের ছেলের দেখাশুনা করেন ও তাকে মানুষ করতে থাকেন। কিন্তু মাত্র ৫ বছর বয়সে অকালে তাঁর সেই ছেলে মারা যায়। ভগবানের উপর অভিমানে গোবিন্দ গোপীনাথকে রোজকার পূজা দেওয়া বন্ধ করে দেন ও নিজে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তখন গোপীনাথ স্বয়ং আসেন ও গোবিন্দকে সান্তনা দেন। গোপীনাথ নিজে গোবিন্দকে অস্বত্ব করেন এই বলে যে, তিনি নিজে তাঁর পুত্রের কাজ করবেন ও কোনও দিন পুত্রের অভাব বোধ হতে দেবেন না। গোবিন্দ রেগে গিয়ে গোপীনাথকে বলেন তিনি কোনো দিনও তাঁর পুত্রের অভাব পূরণ করতে পারবেন না। কারণ এই পুত্রই তাঁর মৃত্যুর পর পিতা হিসাবে তাঁর শ্রদ্ধ করত। এই শুনে গোপীনাথ বলেন, তিনি গোবিন্দর সেই ইচ্ছাও পূরণ করবেন। গোবিন্দ ঘোষের মৃত্যুর পর সেই থেকে এখনও পর্যন্ত চৈত্র মাসের একাদশী তিথিতে গোপীনাথ শ্রাদ্ধের বসন পরে ভক্তের শ্রাদ্ধ করেন ও পিন্ড দান করেন।
এখনো এই দিন অগ্রদ্বীপের ঘোষ ঠাকুর বা গোবিন্দ ঘোষের শ্রাদ্ধ করেন স্বয়ং গোপীনাথ বা স্থানীয় ভাষায় 'গুপিনাথ'। গোপীনাথকে মন্দির থেকে বার করে নিয়ে আসা হয় গোবিন্দ ঘোষের সমাধি মন্দিরে। সেখানে শ্রাদ্ধের সব কাজ সেরে আবার নিয়ে যাওয়ায় হয় নিজ মন্দিরে। ভগবান করেন ভক্তের শ্রাদ্ধ, এই রকম উপলক্ষ হয়তো একমাত্র আমাদের বাংলাতেই দেখা যায়।
ভক্তরা এখনও গোপীনাথের এই লীলা দেখতে আসেন। আজ অন্ন মোচ্ছব। সব প্যান্ডেলেই খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। খুব আড়ম্বর কিছু না হলেও খাবারের অভাব নেই। "তুমি কে?" বা "কোথা থেকে আসা হয়েছে?" এই সব প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় না, গেলেই মেলে ভাত-ডাল-তরকারি, কোথাও আবার খিচুড়ী-তরকারী। যে যেখানে খুশি পেট পুরে খাও। আর একটা কথা, বলা হয় যে সাহেবধনীর আদিগুরু চরণ পাল এই অগ্রদ্বীপে এসে হয়েছিলেন বাকসিদ্ধ। তাঁর কথা অনুযায়ী মেলার সময় এই অগ্রদ্বীপের মেলা চত্বরে কোন কুকুর-বিড়াল, কাক-পাখি পর্যন্ত আসে না। বইয়ে পড়েছি আগে এই মেলাতে অন্ন মোচ্ছবের দিন খাবার রাখার জন্যে আলাদা কোন পাত্রের ব্যাবহার হত না, মাটি কেটে সেই মাটিতেই রাখা হত সব খাবার। আর সেখান থেকেই সবাইকে পরিবেশন করা হত। এখন সে সব আর নেই, সবাই গামলা-হারি-কড়াইতে রাখে খাবার। মানুষের ভক্তিকে কে ছাপিয়েছে আজ তার সচেতন। কিন্তু কিংবদন্তী যাই বলুক না কেন, নিজে চোখেও দেখে এলাম। একটা কুকুর, বিড়াল, কাক কিছুই নেই মেলাতে। কুকুর, বিড়াল না হয় তাড়ানো হয়েছে মানলাম কিন্তু কাক বা কোন পাখি নেই সে কিভাবে হতে পারে প্রশ্ন থেকে গেল মনে। মেলা থেকে বেরনোর সময় হল। বেরিয়ে ফিরলাম স্টেশনের কাছে।
আগে থেকেই খবর নিয়েছিলাম স্টেশনের কাছে নতুন গ্রামের। এখন ফেরার আগে সেখানে একবার ঢু মেরে যাবো। আমরা প্রায় অনেকেই দেখেছি কাঠের তৈরী, রঙ করা পেঁচা আর গৌরাঙ্গ। এই নতুন গ্রামই হল আমাদের বাংলার এই traditional art জন্ম ও পালন স্থান। একটা গ্রাম যার প্রতিটা ঘরে ঘরে এই কাজ হচ্ছে। কেউ কেউ ঘরে কাজ করছেন আবার কেউ কেউ তাদের এই কাজ নিয়ে গেছেন মেলাতে বিক্রি করতে। আমার ধারণা ছিল শুধুমাত্র পেঁচা ও গৌরাঙ্গ তৈরী হয় কিন্তু দেখলাম আরো কিছু। কাঠের উপর অসামান্য সুন্দর কাজের দূর্গা মূর্তি আর মুখোশ। খুব কষ্ট করে বানানো কাজগুলো। হাতের নিপুণ কাজ পকেট খালি করতে বাধ্য করায়। জিনিস গুলো সবই ঘর সাজানোর উপকরণ। হয়তো আমরা অনেকেই কিনি শহুরে showroom থেকে। যা দাম দিয়ে কিনি তার সিকিভাগ হয়তো এনারা পান। তাই দরকার হলে সরাসরি এখান থেকে কেনাই ভালো।
তথ্যঃ
১. উৎসবে মেলায় ইতিহাসে- সুধীর চক্রবর্তী
২. http://templesofbengal.blogspot.in/2016/09/gopinath-temple-agradwip-bardhaman.html
৩. http://doorersathi.blogspot.in/2016/08/gopinather-mela-agradwip-burdwan.html
৪. http://www.mayapur.com/2015/govinda-ghosh-disappearance-day-agradwip-mela/
৫. http://wikiedit.org/India/Agradwip/108880/
৬. http://agradwip.blogspot.in/2012_04_01_archive.html
৭. http://henabasu.blogspot.in/2014/01/agradwip-gopinath-gaudiya-vaisnava.html













No comments:
Post a Comment