হংসেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন অপূর্ব পোড়া মাটির কাজ সমৃদ্ধ মন্দিরটি "অনন্ত বাসুদেব" মন্দির। ১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্টা করেন রামেশ্বর দত্তরায়। রামেশ্বর দত্তরায় যার আদি বাড়ী বর্ধমান অন্তর্গত পাটুলিতে। পরবর্তীকালে বংসবািটতে(বর্তমান নামানুসারে বাঁশবেড়িয়া) রাজধানী স্থাপন করেন।
রামেশ্বরের পুত্র রঘুদেব, রঘুদেবের পুত্র গোবিন্দদেব, গোবিন্দদেব আর হংসেশ্বরী দেবীর পুত্র নৃসিংহদেব। এই হংসেশ্বরী দেবীর নামেই বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির। নৃসিংহদেবই হংসেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠারম্ভ করেন।
গোবিন্দদেব অপুত্রক অবস্থায় মারা যাবার তিন মাস পর জন্ম হয় নৃসিংহদেবের। নিজ পিতৃসম্পত্তি উদ্ধারের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন রাজা নৃসিংহদেব তাঁর মা হংসেশরী দেবীর কাছে। তাই ১৭৯২ খ্রীষ্টাব্দে নৃসিংহদেব পিতৃসম্পত্তি উদ্ধারের জন্যে অর্থ উপার্জনের হেতু কাশি যাত্রা করে। রাজ্য ত্যাগের সময় তিনি চার লক্ষ টাকা রেখে যান ও নির্দেশ দিয়ে যান, যেদিন ওই অর্থ সাত লক্ষ হবে, সেই দিন ওনাকে খবর দিতে। যদিও খবর দেওয়া হলেও আর পিতৃসম্পত্তি উদ্ধার হল না নৃসিংহদেবের(প্রসঙ্গগত উল্লেখ্য রাজকোষে সাত লক্ষ টাকা জমানোর জন্যে নৃসিংহদেবের বড় রানি মহামায়া মহারাজকে না জানিয়ে নিজের গহনা পর্যন্ত বিসর্জন দেন)। কোনো এক ছোট ঘটনা কখন এবং কি ভাবে একজন মানুষের জীবনের অমূল পরিবর্তন করতে পারে সেটা সম্ভবত কেউই বলতে পারে না। তেমনই ইতিমধ্যে নৃসিংহদেবের জীবনের অন্তররাজ্যে এক অমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। কাশীতে থাকা কালীন একদিন রাতে মাতৃরূপে দৈব দর্শন হল রাজা নৃসিংহদেবের। তিনি তাঁর মা হংসেশ্বরী দেবীকে দেখলেন এক জগজ্জননী মাতৃরূপে। পরের দিনই তিনি স্থির করলেন, রাজকোষে জমা টাকা দিয়ে তিনি আর কিছু না, বংসবািটতে একটি মন্দির তৈরি করবেন, এক মাতৃ মন্দির, মা হংসেশ্বরী দেবীর মন্দির।
সংসার তো ত্যাগ করেছিলেন অনেক দিন আগেই, এখন তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। জীবনের লক্ষ্য পাল্টে গেল তাঁর। ১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ফিরলেন কাশী থেকে। ক্রয় করে আনলেন সাত নৌকা চুনা-পাথর, মন্দির তৈরির জন্যে। উত্তরখণ্ড থেকে আনা হয় প্রস্তর শিল্পী।
কিন্তু ১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে মন্দির
অসমাপ্ত রেখেই এই ভবলীলা সাঙ্গ করে বিদায় নেন সন্ন্যাসী নৃসিংহদেব।
এখানে বলে রাখা দরকার হংসেশ্বরী
মন্দিরটি তৈরিতে নৃসিংহদেবের থেকে অনেক বেশি ভূমিকা ছিল, তাঁর ছোট রানি, শঙ্করী
দেবীর। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শঙ্করী দেবী বহু বাধা, বহু প্রতিবন্ধকতার সাথে দাঁতে দাঁত
চেপে লড়াই করেন। এমনকি নৃসিংহদেবের এক পালিত পুত্র কৈলাসদেবের সাথে জমি জমা
সংক্রান্ত মামলায় পর্যন্ত জড়িয়ে পরেন তিনি। কিন্তু শঙ্করী দেবীর জীবনের একটাই
উদ্দেশ্য ছিল, ওনার স্বামীর স্বপ্ন সম্পূর্ণ করা। অবশেষে ১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে সমাপ্ত
করেন হংসেশ্বরী মন্দির নির্মাণ।
হংসেশ্বরী দেবীর মূর্তি, ঠিক এই রকম রূপ
দেখেছিলেন রাজা নৃসিংহদেব কাশিতে। এক অপূর্ব মূর্তি।
মায়ের বাম পা দক্ষিণ জঙ্ঘার উপর ওঠানো। বাম দিকের ওপরের হাতের খাড়্গ, নিচের
হাতে নরমুন্ড, ডান দিকের উপরের হাতে অভয় মুদ্রা, নিচের হাতে শঙ্খ। দেবি বসে আছেন
মহাদেবের নাভিমূলের থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর।
অনন্ত বাসুদেবের মন্দির
অনন্ত বাসুদেবের মূর্তি
রাজবাড়ির প্রধান
প্রবেশ দ্বার
বংসবাটির রাজবাড়ি। ভেতরে ঢুকতে পারিনি তাই একমাত্র একটাই দিতে পারলাম। ভেতরে ঢুকতে দিলে হয়তো
আরো কিছু ছবি পেতাম।
================================
তথ্যঃ হংসেশ্বরী- নারায়ণ সান্যাল, উইকিপিডিয়া।
















মন্দিরের গঠনশৈলী নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলাম। ইন্টারনেট এবং আমার চেনা পরিচিত যেক'টি বই আছে তাতে এর গঠনশৈলীর প্রভাব কোন দেশের তা পেলাম না। তবে শিখা ব্যানার্জী (http://www.chitrolekha.com/.../09_Hanseswari_Temple...), অনিল ভোরা (https://anilvohraphotography.wordpress.com/.../hanseswari/) এবং নন্দিনী'র (http://www.mapsofindia.com/.../the-gracefully-unique...) লেখা থেকে পাওয়া যায়ঃ
ReplyDelete“Built in the early 19th century, the temple is dedicated to Goddess Hanseswari, a manifestation of Goddess Kali. The architecture of this temple, which is truly exceptional in all forms, is the prime attraction of this place. The complex of the temple stands at a height of 27.5 meters and has a total number of 13 towers. The peak of each tower represents a lotus flower. The idol of the presiding four-armed goddess is made up of blue neem-wood. It is a six-storey shrine that follows the structure of a human body consisting of Ira, Pingala, Bajraksha, Sushumna and Chitrini.
The unusual architecture of the Hangseswari temple represents the “Tantrik Satchakrabhed”. The construction of the temple was started by Raja Nrishinghadeb Roy but was later completed by his wife Rani Shankari.”
দুর্ভাগ্য, যে মানুষটি এই মন্দিরের উপর আস্ত উপন্যাস লিখলেন, জীবনের একটা বড় সময় ব্যয় করলেন ভারতের বিভিন্ন দেব-দেউলের স্থাপত্য ও ভাষ্কর্য নিয়ে, সেই নারায়ণ সান্যালও এই মন্দিরের ডিজাইনার সম্পর্কে, বা মন্দিরের স্থাপত্যকলা সম্পর্কে নীরব রইলেন, যা তার স্বভাববিরুদ্ধ। কেবল ‘হংসেশ্বরী’ উপন্যাসের তিনটি জায়গায় ক্ষীণ একটা সূত্র পাচ্ছি। তা হলঃ
১। (এটা কাশী থেকে, অর্থাৎ উত্তর ভারত থেকে) লক্ষ রৌপ্যমুদ্রায় তিনি ক্রয় করলেন সাত নৌকাবোঝাই চুনার-পাথর (এই পাথর মূলত উত্তর/উত্তর-পশ্চিম ভারতে মেলে)। ... পোড়ামাটির কাজ এই জোলো আবহাওয়ায়, ক্রমাগত বার্ষিক ধারাপাতে অত্যন্ত দ্রুত অবক্ষয়ের দিকে ঢলে পড়ে। ... তাই হংশেস্বরী মন্দির গড়বেন প্রস্তরে, পোড়ামাটিতে নয়। [নারায়ণ সান্যালের দশটি উপন্যাস; পৃষ্ঠা ১৪৪]
২। ইতোমধ্যে উত্তরখণ্ড থেকে এসেছে দক্ষ কারিগর। প্রস্তরশিল্পী। চুনারপাথর দিয়ে তারা তিল তিল করে গড়ে তুলছে নৃসিংহদেবের ‘তাজমহল’। [ঐ, পৃষ্ঠা ১৪৯]
৩। উত্তরখণ্ডের বৃদ্ধ মিস্ত্রী খোদাতালার নামে কসম খেয়ে বলেছিল, আপনি আমার মা। নিশ্চিন্ত থাকুন রানিমা - আমরা ত্ঞ্চকতা করব না। দিবারাত্র পরিশ্রম করব। [ঐ, পৃষ্ঠা ১৬৩]
অর্থাৎ, সেই হিসাবে খাঁটি উত্তর ভারতীয় প্রভাবান্বিত মন্দির এবং মুসলিম শিল্পকলাসমন্বিত। বিদেশী প্রভাববর্জিত কি না তা সাহস করে বলতে পারি না, তবে আগের কমেন্টসে মন্দিরের গঠনশৈলীর মূল ভাবনাটাকে নজর দিলে বিদেশী প্রভাব আরোও ক্ষীণ লাগে।
আরেকটা কথা, যথেষ্ঠ তথ্যসমৃদ্ধ এবং ছবি দিয়ে এই যে লেখাটা, তা মন ভরিয়ে দিল। আরোও এরকম লেখার অপেক্ষায় রইলাম...
ReplyDelete