Monday, 18 September 2017

অগ্নিপথ ৪ – নিষ্প্রভ অনল


স্থানঃ নৈহাটী
কালঃ ২০১৭
পাত্রঃ প্রফেসরছাত্রী
কেমন আছো?
     ভালো আছি স্যার। আপনি কেমন আছেন?
     আমিও ভালতারপর বলোতোমার ছাত্রীকে পড়াতে কেমন লাগছে?
     খুবই ভালো স্যার। খুব স্মার্ট আর বুদ্ধিমতী।
     তা ওঁকে নাকি আজকাল আগুনের ইতিবৃত্ত নিয়ে গল্প বলছ? (অগ্নিপথ এর আগের পর্বগুলো দ্রষ্টব্য)
     হ্যাঁ স্যারআর ওইজন্যেই আজ আপনার কাছে আসা। আমার কিছু কিছু ব্যাপার জানার আছে আপনার কাছ থেকে।
     নিশ্চই। কি জানতে চাও?
     আমাদের সৌরজগৎ আর বহির্বিশ্ব সম্পর্কে কিছু তথ্য। নিজস্ব কৌতুহলও আছে বলতে পারেন।
     অবশ্যই বলবপ্রথমে আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। এই যে সৌরজগৎআমাদের সপ্রভ আলোকবিন্দু সূর্য থেকে উৎপন্ন নিষ্প্রভ মূল বস্তুমানে প্ল্যানেটতাদের স্যাটেলাইটকুইপার বেল্ট – এই সমস্ত নিয়েই তো আমাদের সৌরজগৎমানে সোলার সিস্টেম। তা এই ‘প্ল্যানেট’ কথাটা কোথা থেকে এসেছে?
     গ্রীস থেকে। এর মানে ‘পরিব্রাজক’ বুধশুক্রমঙ্গলবৃহষ্পতি আর শনি – এইক’টা গ্রহচাঁদ আর সূর্য – এদেরকে নিয়েই এই প্ল্যানেট শব্দটির ক্রমবিকাশ।
     আর নিশ্চয় এও জানো যেতখনকার দিনে পৃথিবীকে বিশ্বের কেন্দ্রস্থল ভাবা হত। আর বাকীরা তার চারপাশে ঘুর্ণায়মান।
     হ্যাঁ। স্বয়ং এরিস্টটল এই মতের প্রতিষ্ঠাতা। তার শিষ্য সেনাপতি টলেমি প্রথম কসমোলজিক্যাল মডেল বানায়যার কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবী। আমি সে মডেল দেখেছি।
     বাঃতাহলে তো অনেকটাই জানো। আমার কাছে কি কারণে এসেছোঅতীত ইতিহাস তো তোমার জানা। আমার নাতনী তো আমায় বলেছে তুমি ইতিহাসের গল্প বলোআর গ্রহের সাথে আগুনের সম্পর্ক কি?
     স্যারআমার মনে হয়যেহেতু নক্ষত্র থেকেই গ্রহগুলোর উৎপত্তিতা আগুনের গোলক থেকেই তো তাহলে আগুনের গোলকের সৃষ্টি এই পৃথিবীর কথাই ধরুন না কেন এখনো এর কেন্দ্র থেকে লাভা বেরিয়ে আসে অর্থাৎ এরা কিন্তু সত্যিকারের নিস্প্রভ নয় ভেতরে ভেতরে আগুন ধিকিধিকি জ্বলছেই আর তাছাড়া এরা এককালে অগ্নিগোলক ছিলআজ শান্ত ঠান্ডাতা এদেরও তো ইতিহাস ছিল আমি সেই কারনেই ওকে এগুলোর কথা বলব তবে শনির পরে যে গ্রহগুলো আবিস্কৃত হয় তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন আমায়। ওদের আবিষ্কার কীভাবে হলদূরবীন ছাড়া তো কোনভাবে ওদের দেখা সম্ভব নয়। তাও এত বড় কক্ষপথ যে বিশেষ করে নেপচুনপ্লুটো এদের তো দেখাই মুশকিল,বা আলাদা করে গ্রহ বলে চেনা দায়। এটা আমার নিজের কৌতুহল বলতে পারেন। আর তাছাড়া ইদানীং শুনছি নবম গ্রহ একটা আবিস্কার হতে চলেছে। বিজ্ঞানীরা তো অন্তত তাই দাবী করছে। সেটা সম্পর্কে কিছুই জানি না। কীভাবে বিজ্ঞানীদের মনে হল যে নবম গ্রহ একটা আছেএই সমস্তই সংক্ষেপে আমি জানতে চাই।
চিত্র ১: ইউরেনাস – শনির বাবা
     ওশোনো তবে। শনির পর থেকে শুরু করি। ১৬৯০ সালে জন ফ্ল্যামস্টিড নামে একজন বিজ্ঞানী বৃষ নক্ষত্রমন্ডলে এক অজ্ঞাত নক্ষত্র দেখতে পান। পাত্তা দেননি খুব একটা। আকাশে তো বহু তারা আছে। কে মাথা ঘামায়। সেই সময়ে বৃষ নক্ষত্রমন্ডলে প্রায় ছয়বার আলোকবিন্দুটিকে সনাক্ত করেন বটেএবং তার লগবুকে লিখেও রাখেন নাম দেন ৩৪ টাউরিকিন্তু ওই পর্যন্তই। এর বেশি আর কিছু লেখেননি। অবশ্য তার আগে অনেকেই একে দেখেছেন। ১২৮ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে হিপারর্কোস একে প্রথম দেখেন বলে দাবী করা হয়। ওনার গ্রন্থে এই গ্রহের উল্লেখ আছে তারা হিসাবেই। ফরাসী মহাকাশবিজ্ঞানী লেমোনিঁয়র একে প্রায় বারো বার দেখেন। কিন্তু দেখলে কি হবেওটা যে তারা নয়,গ্রহ তা এদের মাথায় ঢোকে নি। মাথায় ঢোকে হার্সেলের। ১৭৮১ সালে গায়ক তথা শখের মহাকাশবিজ্ঞানী হার্শেল আর তার বোন ক্যারোলিনদুজনে মিলে বানিয়েছিল যে দুরবীন তাতে মিথুন রাশিতে ধরা পড়ে গ্রহটা। তারা অবাক। হলুদসবুজ রঙের জিনিসটা ধুমকেতু কি না তা নিয়ে ভাইবোনে মতবিরোধ। দেখা যায় ওটার কক্ষপথ বৃত্তাকার। এতএব ওটা যে গ্রহ সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় তখনই। হইহই পড়ে যায়। রাজা খেতাব দেন। এক ধাক্কায় বড়লোকবড় মানুষবড় বিজ্ঞানী। তবে নামকরন নিয়ে গোলযোগ শুরু হল। কেউ বলে নাম হোক হার্শেলহার্শেল বলেনাম হোক জর্জিয়ান সাইডাস (তখন ব্রিটেনের রাজা ছিলেন তৃতীয় জর্জ), বাইরের বাকি বিজ্ঞানীরা ও নামে ডাকতে নারাজ। এতএব আট বছর পরে যে বছর তেজস্ক্রিয় মৌল ইউরেনিয়াম আবিস্কৃত হয়সেই মৌলের নাম অনুসারে নাম রাখা হয় ইউরেনাস। আরো একটা কারন হিসাবে বলা হয়গ্রীক পুরাণে বৃহস্পতির পিতা শনিআর শনির পিতা ইউরেনাস। তাই এর নামও ইউরেনাস। পরবর্তীকালে ভয়েজার ২ কে যখন পাঠানো হলএবং তার দেওয়া ছবি অনুযায়ী দেখা গেল এর ২৭ টি উপগ্রহ(এখনো পর্যন্তআছেএবং আছে শনির মত অসংখ্য বলয়। এই বলয়গুলোর বেধ মাইক্রোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ১ মিটার পর্যন্ত। এ পর্যন্ত অন্তত দুটি বলয়ের সন্ধান পাওয়া গেছেযাদের বিস্তৃতি কয়েক কিলোমিটার। এই বলয়গুলোর উপাদান উপগ্রহের খণ্ডাংশ দ্বারা গঠিত বলেই অনুমান করা হয়। এখন পর্যন্ত ১৩টি উজ্জ্বল বলয় সম্পর্কে ধারণা করা গেছে। এদের বলয়গুলোর রঙ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। হাল্কা ধূসরলালনীল রঙের বলয় দেখা যায়। তাই সব মিলিয়ে ইউরেনাসকে দেখতে কিন্তু খুব সুন্দর লাগে আমার নিজের শনির চাইতে ইউরেনাসকে বেশি সুন্দর লাগে মজার কথা কি জানোএর একটি মেরু সূর্যের দিকে প্রায় ৪২ বৎসর থাকেএই সময় অন্য মেরু অন্ধকারে থাকে। আর র উপরিতলের গড় তাপমাত্রা ১৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে শীতলতম অবস্থায় তাপমাত্রার পরিমাণ দাঁড়ায় ২২৪ সেলসিয়াস। বিষুব অঞ্চলে প্রায় ২৫০ মিটার/সেকেন্ড বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়।
চিত্র ২: নেপচুন – সম্ভাব্য পাঁচ দৈত্যগ্রহের একটি
কিন্তু সমস্যাটা হল ইউরেনাসের কক্ষপথ যেরকমটা হওয়া উচিত ছিলসেরকম আদৌ পাওয়া গেল না। চল্লিশ বছর ধরে এর কক্ষপথ বিচার করতে গিয়ে হিমসিম খেল লোকজন। কেপলারনিউটনের সূত্র মেনে চললেএবং বৃহস্পতি ও শনির আকর্ষনের তীব্রতায় যতটুকু বিচ্যুত হওয়ার কথা তেমনটি ধরে গণনা করলে কক্ষপথ যেমন হওয়া উচিত ছিলআদৌ তেমন হল না। মনে হচ্ছে তার কক্ষপথ কীসে যেন ধাক্কা খেয়ে বারবার গতি হারাচ্ছে। পথে কোন গ্যাসের আস্তরণে ধাক্কা খেয়ে এরকম হচ্ছেনা আর কোন কারণ আছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অবশেষে দু’জন বিজ্ঞানী (অ্যাডামস এবং লেভেরিয়ারবললেনআসলে ওটাকে টানছে আরেকটা গ্রহ। তা ছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। তোমরা রোসোআমরা ওটাকে খুঁজে বের করছি।
     ব্যাসদুজন বিজ্ঞানী অঙ্ক কষে খুঁজতে লেগে গেলেন। বেরও করে ফেললেন। রাতের আকাশে অমুক সময়ে তমুক স্থানে দুরবীন তাক করলে অবশ্যই দেখা মিলবে সবেধন নীলমণিটির। তাঁরা তাঁদের দেশের মানমন্দিরকে অনুরোধও করলেন। কিন্তু মানমন্দিরের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তারা কথা শুনবে কেনঅবশেষে জার্মান বিজ্ঞানী গাল এগিয়ে এলেন। তিনি ও তার সহকারী তাগ করলেন সেই দিকেসেই সময়ে। আবিস্কৃত হলেন নেপচুনসমুদ্রের দেবতা। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার কি জানোআগে অঙ্ক কষে তারপরে আবিষ্কার। একজন (দমিনিক আরাগোতো বলেই ফেললেন, ‘নেপচুন আবিষ্কার হল কলমের ডগা দিয়ে।’ ইউরেনাসের মত নেপচুনেরও অনেকগুলো উপগ্রহ। প্রায় ১৪ টি উপগ্রহ নিয়ে নেপচুনের ঘর সংসার।
চিত্র ৩: নরকের অধিপতি ও তার স্যাটেলাইট
     কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও দেখা গেলইউরেনাসের কক্ষপথের গতি ভারসাম্যহীনতা নেপচুনের আকর্ষণ বল দ্বারা মিটছে না। আরোও কোন আকর্ষণ বল অবশ্যই কাজ করছে। আরো কোন গ্রহ কি?ধরপাকড় শুরু হল। অঙ্ক কষাদুরবীন তাগ করার হুল্লোড় পড়ে গেল। প্ল্যানেট এক্স –কে খোঁজার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন আর সব বিজ্ঞানীদের সাথে সাথে লোয়েব। এই লোয়েব কিন্তু তখনকার দিনে কুখ্যাত। ইনি দাবী করেনমঙ্গলগ্রহে উন্নত প্রাণী বসবাস করে তাদের পরিখানালা তারই সাক্ষ্যপ্রমাণদুরবীনে দেখা গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে তাকে নিয়ে দারুন হাসাহাসি। এমতাবস্থায় ধনকুবের লোয়েব তার বানানো মানমন্দিরে বসে চেষ্টা করলেন গ্রহটিকে আবিস্কার করারকিন্তু পারেন নি। পর্যবেক্ষণ চালানো অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয় এবং তার ১৪ বছর পর ওই মানমন্দির থেকেই আবিষ্কৃত হয় প্ল্যানেট এক্স। মানমন্দিরের কর্তাব্যাক্তিরা নাম দেন প্লুটো – নরকের দেবতা।
     এখন সমস্যা হল গ্রহটিকে নিয়ে। এই প্লুটো গ্রহের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে না। প্লুটো নিজেই একটা বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। শ্যারণপ্লুটোর উপগ্রহ আকারে প্লুটোর অর্ধেক। প্লুটো বাকী আটটা গ্রহের সাথে একই তলে অবস্থিত নয়। প্রায় ১৭ ডিগ্রী ত্যারছা করে ঘোরে। অনেকে বলতে লাগলেনপ্লুটো নেপচুনের উপগ্রহ ছিলতালেগোলে ছিটকে গিয়ে এরকম বাউন্ডুলে হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া তার আশেপাশেই আছে বিখ্যাত কুইপার বেল্ট। ওখান থেকেই তোমাদের ভাষায় ‘টাসকি’ খেয়ে সরে এসেছে কি না তা কে বলবেমোট কথাবিজ্ঞানীরা বেঁকে বসলেন একে গ্রহের সংসারের সদস্য বানাতে। তার ওপর ‘সেডনা’ (মতান্তরে জেনাআবিষ্কার হওয়াতে ঝামেলা বাড়ল। সেডনা প্লুটোর থেকে আকারে বড়। কিন্তু হলে কি হবেসে হল ‘কুইপার বেল্ট অবজেক্ট’ (KBO), মানে কি না গ্রহানু, ‘নট্‌’ গ্রহ। নাকালের একশেষ। ২০০৬ সালে গ্রহের নতুন সংজ্ঞা যা হল তাতে সেডনা আর প্লুটো দুজনেই তার শর্তপূরণে অক্ষম। অবশেষে ঘোষণা হয় যে,প্লুটো হল বামন গ্রহ। কোন গ্রহই নয়। এই রিসেন্টলি২০১৫ সালে নিউ হরাইজন প্লুটোর একদম কাছাকাছি গিয়ে একে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে।
চিত্র ৪: অজ্ঞাত গ্রহের সম্ভাব্য কক্ষপথ
     এখন সমস্যা আবার একটা শুরু হল। বিজ্ঞানীদের হিসাবে পাঁচটা জায়েন্ট প্ল্যানেট থাকার কথা। আছে চারটে। আরেকটা কইইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা KBO আবিস্কার ও তাদের গতিপথের প্রকৃতি দেখে ধারণা হল ওইখানে আরেকটা বড় কোন গ্রহ থাকার ফলে এমন ভজোকটো ব্যাপার ঘটছে। প্লুটোর মতন ওদের কক্ষপথও আটটা গ্রহের তলে নেই। একটু কোণ করে উপরেনীচে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর অবাক ব্যপারসবকটা KBO একই সময়ে কক্ষতল ভেদ করে। আর তাও কখননা যখন ওরা সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে। এতএবতৈয়ার মাঝিচালাও পানসি। কুইপার বেল্টে যে ভারী গ্রহটি ‘ছেঁড়খানি’ চালাচ্ছে তাকে পাকড়াতেই হবে এবার। তাহলে কেমন হবে সেই নবম গ্রহ?জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমানওটা সুপারআর্থ। পৃথিবীর দশ গুণ ভারী। সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে ৩,৭৫০ কোটি কিলোমিটার দূরত্বে। অর্থাৎসূর্য থেকে পৃথিবীর প্রায় ২৫০ গুণ দূরত্বে। কত সময় লাগছে নবম গ্রহের সূর্য প্রদক্ষিণ করতেআমাদের হিসেবে ২০,০০০ বছরতাকে পাবে কি করে?কেউ জানে না। এ হল অনেকটা খড়ের গাদায় ছুঁচ খোজার মতন। কিন্তু এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের একটাই গান “হাল ছেড়ো না বন্ধু”। এখন পরিকল্পনা চলছেকোন উপগ্রহ নবম গ্রহের সন্ধানে পাঠাতে। কারণ পৃথিবীতে বসে দুরবীনের সাহায্যে সে গ্রহকে সনাক্ত করা রীতিমতো কঠিন।
     বাপরেএত্তসব ব্যাপার!
     হুঁ… আর একটা মজার কথা কি জানো?
     কি?
     ব্যাসদেব ‘নবগ্রহস্তোত্রম’ আবিস্কার করে গেছেন পুরাকালেই। তা মহাভারতের কথককারকে মহাভারতের সময়কালেই ধরা হলেমনে করো১৫০০ বা ১১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দেই কিন্তু ভারতীয়রা বিশ্বাস করতআকাশে ন’টা গ্রহ আছে। তারা কিভাবে এই বিশ্বাস করেছিলভগবান জানেন। কিন্তু এক্কেবারে ঠিক ন’টা!!! অবশ্য এক্ষেত্রে সূর্যকে আর চন্দ্রকে বাদ দিলেপ্লুটো গ্রহের তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার পর আমার মনে হাসি এসেছিল। কিন্তু এখন তাদের বিশ্বাসকে আর কল্পনাশক্তি বলতে ভয় লাগে। আর যাই হোকওই প্ল্যানেট এক্স আবিস্কার হলে কিন্তু আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের কুর্ণিশ জানাতেই হবে।
চিত্র ৫: চাঁদমামা
     স্যারউপগ্রহগুলোর সম্পর্কে কিছু বলুন না
     চাঁদ পৃথিবীর অংশ ছিলজানো তো?
     হ্যাঁ স্যার… আর চাঁদের কোন আহ্নিক গতি নেই। আমরা আবহমানকাল ধরেই চাঁদের একটা পিঠই দেখতে পাই। সে আস্তে আস্তে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমানে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যত দূরে সরছেজোয়ার ভাটার আকর্ষণ তত কমে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে এই আকর্ষণ একদিন নষ্ট হয়ে যাবে।
     শুধু তাই নয়, ‘বেরিকেন্দ্র’ নামে যে অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চন্দ্রের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীতে জোয়ারভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী জোয়ারভাটা সৃষ্টির জন্য যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবীচাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তাতে বিভব শক্তি কমে যায় এই কারণে এই দুইটি জ্যোতিষ্কের মধ্যে দূরত্ব প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায় যতদিন না পৃথিবীতে জোয়ারভাটার উপর চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতেই থাকবে এবং যেদিন প্রশমনটি ঘটবে সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে
     তার মানে তখন চাঁদের কক্ষপথের ব্যাসার্ধ তখন ধ্রুবক?
     ঠিক তাই… আর প্রাচীনকালে সবাই চাঁদকে গ্রহ হিসাবেই ধরত। এরিস্টটল তো বলেই বসলেন,চাঁদের যে দিকটা আমরা দেখছিসেই দিকটায় সাগর আছে। তাই ওদিকটার নাম মারিয়া (Maria,মারে – ল্যাটিনে এর অর্থ সাগর) সব গোলমালের অবসান করলেন গ্যালিলিও তার দুরবীন দিয়ে। দেখলেনওগুলো এবড়ো খেবড়ো পাহাড় পর্বত ছাড়া আর কিছুই নয়। চাঁদে স্ট্যলাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইট আছে বটেতবে জলের চিহ্নমাত্রও নেই সেখানে এমনটা দাবী করা হয়১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের অ্যাপোলো অভিযানে চাঁদ থেকে আনা পাথরখণ্ড পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা প্রথম দাবি করেছিলেন যেচাঁদে জল রয়েছে তারপর ভারত তাদের প্রথম চন্দ্রাভিযানের (চন্দ্রযানপর একই দাবি করে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা চন্দ্রযান ছাড়াও দুটো মার্কিন নভোযানের (ডিপ ইমপ্যাক্ট  ক্যাসিনিপাঠানো উপাদান বিশ্লেষণ নিশ্চিত হয়ে এমন দাবি উত্থাপন করেন ভারতীয় নভোযানটি নাসার সরবরাহকৃত চন্দ্রপৃষ্ঠের ২৩ ইঞ্চি গভীরে অনুসন্ধানক্ষম মুন মিনারেলজি ম্যাপার (এম৩নামক একটি যন্ত্রের সহায়তায় চন্দ্রপৃষ্ঠের মেরু অঞ্চলে সূর্যের প্রতিফলিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরীক্ষা করে প্রমাণ পায় যে চাঁদের মাটির ১০,০০,০০০ কণায় জলের কণা হলো ১,০০০গবেষণায় চন্দ্রপৃষ্ঠের পাথর ও মাটিতে প্রায় ৪৫% অক্সিজেনের প্রমাণ মিলেছে তবে হাইড্রোজেনের পরিমাণ গবেষণাধীন রয়েছে (২০০৯) অবশ্য গবেষণায় এও বলা হয় যেচাঁদের মেরু অঞ্চলের নানা গর্তের তলদেশে বরফ থাকলেও চাঁদের অন্য অঞ্চল শুষ্ক চাঁদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর ঘূর্ণন ধীরতর হতে হতে একটি নির্দিষ্ট গতিতে এসে locked হয়ে যায় পৃথিবী দ্বারা সৃষ্ট জোয়ারভাটা সংক্রান্ত বিকৃতির সাথে সম্পর্কিত ঘর্ষণ ক্রিয়ার কারণেই এই লকিং সৃষ্টি হয় উপরন্তু,চান্দ্র কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা থেকে যে ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সৃষ্টি হয় তার কারণে পৃথিবী থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠের শতকরা প্রায় ৫৯ ভাগ দৃশ্যমান হয়ে উঠে এই পরিবর্তনের ক্রিয়াটিকে লাইব্রেশন বলাহয়
     বাকি উপগ্রহগুলোর সম্পর্কে কিছু বলুন না…
চিত্র ৬: স্যাটেলাইট/উপগ্রহ
মঙ্গলের তো দুটো উপগ্রহ – ফোবোস আর ডিমোস জুপিটারের এখোনো পর্যন্ত ৪৭টা উপগ্রহ আবিস্কার হয়েছে সবক’টার নাম তোমায় বলতে গেলে আমায় বই খুলতে হবে তবে এটুকু বলি,সবচেয়ে বড় উপগ্রহ গাইনামেডে। এছাড়া ক্যালিস্টোআইওইউরোপাথিবেমেটিস এইরকম আরো আছে। শনিও কম যান নাকমপক্ষে ২১টা উপগ্রহ আছেযার মধ্যে প্রধান টাইটাননাম তো শুনেইছ। এছাড়া রিহাডাইওনেপ্রমেথিয়াসপ্যান্ডোরাএটলাস ইত্যাদি। ইউরেনাসের ২৭ টা – টাইটানিয়া সবচেয়ে বড়। এছাড়া আছে এরিয়েলমিরান্দাপোর্শিয়াওফেলিয়াকিউপিড ইত্যাদি ইত্যাদি। নেপচুনের ১৩ টার মধ্যে ট্রিটন সবচেয়ে বড়। প্লুটোর কিন্তু শ্যারন ছাড়াও ছোট্ট ছোট্ট দুটো উপগ্রহ আছে – নিক্স আর হাইড্রা। এরিসআরেক বামন গ্রহের আছে একটি উপগ্রহ – ডিসনোমিয়া। এই হল মোটামুটি লিস্টি।
     বাপ রে…!!!
     আমাদের সৌর জগতের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪০টি প্রাকৃতিক উপগ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে এর মধ্যে ১৬২টি উপগ্রহ গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরছে৪টি উপগ্রহ ঘূর্ণায়মান আছে বামন গ্রহকে কেন্দ্র করে এবং অন্যগুলো ক্ষুদ্র সৌর জাগতিক বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান আছে অন্যান্য তারা এবং তাদের গ্রহদেরও উপগ্রহ রয়েছে সবার সম্বন্ধে বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। আর তাছাড়া আমার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। ঘড়িতে ক’টা বাজে তা খেয়াল আছে?
     ও হ্যাঁ তাই তোআপনার বিশ্রাম আজ আর নেওয়া হল না।
     সেটা কোন ব্যাপার নয়। আমার এ ব্যাপারে কথা বলতে বেশ ভালই লাগে। তুমি বরং কাল এইসময় আবার এসো। তোমারও তো বোধহয় আজ খাওয়া হয় নিএখন ক্লাস আছে?
     হ্যাঁ
     আগে কিছু খেয়ে নিয়ে তারপর ক্লাসে যেও কিন্তু। না খেলে শরীর খারাপ লাগবে।
     আচ্ছা স্যার।
     পরের বার তোমাকে সপ্রভ আলোকবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো। নক্ষত্র আর তাদের বিচিত্র জীবনশৈলী
     অবশ্যই স্যার। আমি অবশ্যই আসব।
চিত্র ৭: এক টুকরো চার্ট – বিস্তারিত উইকিপিডিয়াতে উপলব্ধ আছে

     আসি স্যার।
     এসো।
     ছাত্রী দেখলো প্রফেসার একটু মুচকি হাসলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ছাত্রীর কাকা কিন্তু গত পরশু এসেছেজানো নিশ্চই।”
     ছাত্রী নীরব। মুখে একরাশ আবীর। মাথা নীচু। কী লজ্জাপ্রফেসর একই রকম মুখ করে বললেন, “পারলে আমাদের বাড়ী এসো। আগুন নিয়ে কালচার করছ তোও তোমাকে একটা ব্যাপারে হেল্প করতে পারবে। আগ্নেয় অস্ত্র নিয়ে কাজ করছে তোতার ইতিহাস ও তোমাকে আমার থেকে ভাল বলতে পারবে।”
     ইয়ে… উম… চেষ্টা করব স্যার আসার।
     না না এসো। বড়বউ (ছাত্রীর মাপ্রফেসরের বড় পুত্রবধূতোমায় খুব পছন্দ করেন। সেও একবার তোমায় দেখা করতে বলেছে। আসলে আমারও ভাল লাগবে। মহাকাশ সম্পর্কে বেশ কিছু জার্নাল আর বই আমি তোমাকে দিতে পারব।
     আচ্ছা স্যারআসব
     শেষ কথাগুলো প্রায় শোনা গেল না বটেকিন্তু এতদিনের অভিজ্ঞতায় প্রফেসর আন্দাজ করে নিলেনতার ছাত্রী কি উত্তর দিল। আস্তে আস্তে নতমুখী লাজুকলতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
     প্রফেসর জানলা দিয়ে দেখলেনতার ছাত্রী মাথা নীচু করে কলেজ বারান্দা দিয়ে টুকটুক করে হেটে যাচ্ছে। নিজের মনেই নিজে বললেন, “তোমাকে ছাত্রী হিসাবে আমার যতটা পছন্দপুত্রবধূ হিসাবেও ততটাই পছন্দ।”
     প্রফেসর নোট্‌সের খাতাটা হাতে তুলে নিলেন। আজকে আপেক্ষিকতাবাদ পড়াতে হবে
[সব চরিত্র কাল্পনিক]
[ক্রমশ]

No comments:

Post a Comment