Wednesday, 18 January 2017

|| পুরী ||

       


         "খুঁজে বেড়াই আসমান জমি,
আমারে চিনিনা আমি।"
সেই আবার বাইরের ডাক, সেই আবার ঘরের বাইরে নিজেকে খোঁজার পালা। এবারের গন্তব্য প্রকৃতির নীল রঙের আঁচল তলে, পুরী। হাওড়া থেকে ট্রেনে ওঠার সময় কালকুটের "নির্জন সৈকত" এর "দিদি" দের মত কিছু দিদিদের দেখে মনে হল যেন তারা যাচ্ছেন তাদের বহু প্রত্যাশিত জগন্নাথ দেব কে দেখতে।
ট্রেনে না না রকম লোক আর তাদের নিয়ে না না রকম অভিজ্ঞতা। কোথায় বয়স্কদের ঝাঁঝনি তো কোথাও কম বয়সীদের অধৈর্য্যতা। সে সব মিলিয়ে সে এক রকম খিচুড়ী আরকি। তার মধ্যেই চলছে আমাদের বাহন, মানে ওই ট্রেন আর কি। বাইরে মাঠে হালকা কুয়াশার চাদর বিছিয়ে সাথে দ্বাদশীর চাঁদ মাথায় নিয়ে বসে আছে প্রকৃতি।
ট্রেনের এত শব্দের মধ্যেও বাইরের দিকের তাকিয়ে থাকলে কোথাও যেন সেই চেনা নিস্তব্ধতা। সেই চেনা হারিয়ে যাওয়া। ক্ষনে ক্ষনে কত দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে। কখনো আসছে ছোট গ্রামে, আবার কখনো কোনো এক মফঃস্বল জগদ্ধাত্রী পূজোর শেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এক ঝলক। মিনিটে মিনিটে পার করছি কত মানুষকে। যাদের কাউকেই চিনিনা, যাদের কাউকেই হয়তো চিনব না কোনো দিনও। কিন্তু কোথাও যেন আজ চেনা লাগছে ওদের। যেমন এই মুহূর্তে যে ভাবে ওদের অতিক্রম করছি, হয়তো এই একইভাবে কোনো এক দিন আমারদের চিন্তার সুতোও ক্রস করবে বা করেছিল। তাই হয়তো না চিনেও একদম অচেনা লাগছে না কাউকে। এই সম্পর্ক কোনো রাজ্য বা দেশর সীমা মানে না, তার কাছে সবাই সমান। তার কাছে আমার ঘরের লোকটা যেমন তেমনিই এক ভিন দেশের লোক।
গাড়ী যখন পুরী রেল স্টেশনে পৌঁছাল তখন প্রায় সকাল ৬.৩০ টা। স্টেশনে গাড়ী আগে থেকে ঠিক করা ছিল। সেটা করেই আপাতত রওনা দিলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। বেশিক্ষনের পথ না, মিনিট বিশেক। সকালের বেস্ত বাজার তার মধ্যে দিয়েই এগিয়ে গেলাম গন্তব্যের দিকে। সেই চেনা রাস্তার মোর ঘুরতেই সামনে ফাঁকা, বহুদূর ফাঁকা। যাকে দেখতে আসা এতদূর থেকে, শুরুতেই তার দর্শন। সাথে সাথে তার গর্জনও।

পৌছালাম হোটেলে। ঘরোয়া, আধা বাঙালি হোটেল। যেখানে আমাদের মত আস্তানা নিয়েছে আরো অনেকে। দেখলাম একদল বয়স্ক বন্ধুর দল ও এসেছে, তাদের নিয়মিত সংসার জীবন থেকে ছুটি নিয়ে। তাদের মুখে এক অবর্ণনীয় পরিতৃপ্তি। আপাতত ঘরে ঢুকে সকালের গুরুত্বপূর্ন কাজকর্ম গুলো কোনো মতে সেরে, লুচি তরকারি খেয়েই রওনা দিলাম সমুদ্রের দিকে। এ এক অদ্ভুত জায়গা, যার সামনে এলে সবাই যেন শিশু হয়ে যায়। ছোট ছেলে-মেয়েই হোক বা বয়স্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, সবার মুখে একই প্রকাশ। এক অস্থায়ী ছাউনির তলে ৩০ টাকার বিনিময় আমাদের ১০জন বন্ধুর চটি রাখলাম। খুচরো না থাকায় ওনার কাছে ১০০ টাকা দিতে হল। কথা হলো, জল থেকে উঠে এসে বাকি টাকাটা ফেরত নেব। কিন্তু হায় রে আমাদের শিক্ষিত, শহুরে মন। ভয় লাগল "যদি উনি টাকাটা নিয়ে চলে যান!"। যাক সে কথা। জলের সাথে ৩ ঘন্টা লড়াই করে যখন উঠলাম তখনও উনি আমাদের চটি পাহারা দিচ্ছেন। আসলে কি আর করবেন, না দিয়েই বা উপায় কি? উনি তো আর আমাদের মত ঘাপলা শেখেননি। যাই হোক এখন পেটে সকালের লুচি তরকারির কোনো রকম চিহ্নই আর নেই, রাক্ষসের মত খিদে পেয়েছে। ভেতো বাঙালির ভাতের খিদে। হোটেলে এসে স্নান সেরে সোজা চলে এলাম নিচের খাবার দোকানে। কোনো মতে ভাত, ডাল, তরকারি খেয়ে রওয়না দিলাম মন্দিরের উদ্দেশ্যে। সাথে আমার কেমেরা। পথে যেতে যেতে দেখলাম অরবিন্দ আশ্রম, আনন্দময়ী মার আশ্রম। ঢুকলাম চৈতন্য মহাপ্রভুর গম্ভীরায়। যেখানে উনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন এবং বলা হয় যে ওই ঘর থেকেই তিনি শেষবারের মত বেরিয়ে গিয়ে মিলে যান সমুদ্রে। কেমন আশ্চর্য, একজন লোক যে সারা জীবন প্রেমের কথা বলে গেলেন তাঁর কথা আজ নিতান্তই শুধু এক আচার আর কিছু ধর্মীয় নিয়মের প্রান্তে এসে ঠেকেছে। তবে এমন অনেক লোক দেখেছি যারা এখনও মহাপ্রভুর সেই চিরন্তন প্রেমের বাণীকে পাথেয় করে পথ চলছেন। চললাম মন্দিরের উদ্দেশ্যে। দুপাশে না না পশরার দোকান, খাজার দোকান, মিষ্টির দোকান। মন কি তখন আর মন্দিরে আছে? মন তখন আনাচে কানাচে, এখানে ওখানে। কাকে খুঁজে ফেরে জানিনা তবে এটুকু বুঝতে পারছি যে মন আমার কাছে নেই। পা ধুয়ে ঢুকলাম মন্দিরে। দেখলাম ফোনে নির্দেশ দেওয়া পান্ডা, দেখলাম চোখ বুজে একা বসে থাক বৃদ্ধা। দেখলাম জগন্নাথ দেবের গার্ড, মানে উড়িষ্যা পুলিশ কিভাবে মানুষ তারায়। একটু বেগতিক দেখেছে তো কথা নেই, এক্কেবারে ডান্ডা দিয়ে ঠান্ডা। দেখলাম একজন বৃদ্ধা চুপ করে এককোনে বসে একটা কাগজ নিয়ে বসে কি একটা লিখছেন। জিজ্ঞাসা করায় বললেন উনি ওড়িয়া ভাষায় রাম নাম লিখছেন। কেউ বা হাতে মালা নিয়ে জপছেন এক মনে। যে যার নিজের মত করে জগন্নাথ প্রভুকে চিন্তা করছেন, প্রার্থণা করছেন। এতো লোক তার এতো বৈচিত্র্য, দাদার কথায় যেন "মন্দিরের মধ্যে এক ছোট ভারতবর্ষ" দেখলাম। বেরোলাম মন্দির থেকে। চা আর পেঁয়াজের পাকোড়া দিয়ে সন্ধের খাবার সারলাম। চলে এলাম সমুদ্রের ধারে। সারি সারি চেয়ার পাতা। সেখানে গিয়ে বসলাম। সমুদ্রের ঢেউ পায়ে লাগছে। চাঁদের আলো আর সমুদ্রের ঢেউ দুইয়ে মিলে মিশে তখন একাকার। বেশ কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম অনেকটা সময় কেটে গেছে। ওই দিকে খাবার দোকানে বলা আছে রাতের খাবার কথা, দেরি হলে ওরা আবার দোকান বন্ধ করে দেবে। সময় যে কখন ঢেউয়ের সাথে মিলে বহুদূর চলে গেছে তা বুঝতে পারিনি। আজ আপাতত খেয়ে দেয়ে বিছানায়।

সকালে সাগরের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় ৫ টা। উঠে গেলাম সমুদ্রের ধারে। আলো তখনও খুব ভালো ফোটেনি। মাছ ধরে ফিরছে জেলেরা। ছোট ছোট নৌকা, এক একটা তে ২ জন করে। সমুদ্রের জল কেটে পারে পৌঁছানোর এক অভিনব কৌশল ওদের। পারে পৌঁছনোর লড়াই যেন মাঝ সমুদ্রে ভেসে থাকার থেকে অনেক বেশি কঠিন। কি কঠিন জীবন সংগ্রাম, কি প্রবল জীবনী শক্তি। সারা রাত মাছ ধরা, সেই গুলো ভোরবেলা থেকে বেচা, তার পর বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম, আবার বিকাল হতে না হতে সমুদ্রের ধারে যার যার নিজের দোকানে বসা। এই হলো ওদের জীবন ঘড়ি। এই ঘড়ি চলছে তো চলছে, তার কোনো বিরাম নেই, তার কোনো অন্ত নেই। মাছ প্রিয় বাঙালীদের কারণে ওদের মাছ বেচাটা কিছুটা সহজ হয়েছে। দেখলাম নৌকা পারে আসতে না আসতে অপেক্ষারত ভোজন রসিক বাঙালী ঘিরে ধরল ওদের। "কি মাছ?", "কত করে কিলো?", "কম হবে না?" এই রকম না না প্রশ্নবানে জর্জরিত করল। সূর্যের দেখা না পেলেও আলো এখান ফুটেছে বেশ অনেকটা। দেখলাম একদল বৃদ্ধ-বৃদ্ধা খোল করতাল নিয়ে সমুদ্রের দিকে মুখ করে কীর্তন করছেন। যেন বন্দনা করছেন এই মহা সমুদ্রকে, যেন আহ্বান করছেন ওই দিবাকরকে দেখা দেওয়ার জন্যে। ফিরলাম হোটেলে। আজকে সকালের টিফিন সেরে যাত্রা উদয়গিরি, খন্ডগিরি আর কোনারক।








ইতিহাস বলে খ্রিষ্টপূর্ব ২'য় শতাব্দীতে উদয়গিরি, খন্ডগিরির এই গুহাগুলো নির্মাণ করেন জৈন সাধুরা। এইগুলো বানানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত জনস্রোত থেকে নিজেদের দূরে রেখে নিজেদের মধ্যে সেই পরম সত্যকে খোঁজা। মানুষের কি রকম প্রগাঢ় নিষ্ঠা থাকলে সব কিছুর থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে এই রকম একটা জায়গাতে নিজেকে আলাদা করে রাখতে পারে শুধুমাত্র আত্ম উপলব্ধির জন্যে তা উদয়গিরি, খন্ডগিরি না দেখলে বোঝা যায় না। কোনো রকম তুল্য বিচার করতে চাই না। কিন্তু মানুষের শৈল্পিক সত্তা আর সৌন্দর্যবোধের এক চরম নিদর্শন পেলাম এখানে। গুহাগুলো স্থান বিশেষে লীলাক্ষেত্র তে পরিণত হলেও, যথাসম্ভব ওনাদের বিরক্ত না করে ছবি তুললাম(যদিও স্থান বিশেষে ওনাদের কিছুটা বিরক্তি করতে হয়েছে বৈকি)। হাতে সময় খুব বেশি নেই, তার মধ্যেই ছবি তোলা সেরে বেরিয়ে পরলাম কোনারকের উদ্দেশ্যে। পেট ডাকছে সবার। খিদে পেয়েছে। এক হোটেলে ঢুকে সব্জি-ভাতে আজকের দুপুরের খাবার সারলাম। হোটেলের পাশেই এক স্থাপত্য আর মূর্তির দোকান। পাথর কেটে কেটে সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দোকানের কর্মচারীরা কাজ করছেন নিচের কারখানাতে, আর ওপরে সেই সব জিনিসের প্রদর্শনাগার। মনে মনে ভাবলাম কিছুক্ষণ আগের আমার চিন্তা ভুল। উদয়গিরি-খন্ডগিরির স্থাপত্য দেখে মনে মনে কুর্নিশ জানিয়েছিলাম ওই সময়ের মানুষকে। কিন্তু তা না, শিল্প ধারার যে অবিরাম প্রবাহ তা এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে অবিরাম বয়ে চলেছে। ওরা অন্ধকারে ধুলোর মধ্যে দিনের ১২-১৫ ঘন্টা কাজ করে চলেছেন শুধুমাত্র দিনের শেষে কিছু টাকার জন্যে তা আমি বিশ্বাস করি না। আনন্দ, সৃষ্টির আনন্দই হল ওদের বাঁচার রসদ, চলার পাথেয়। আমিও চললাম ওদের স্মৃতিকে আমার পাথেয় বানিয়ে। গাড়ীর দোলাতে চোখটা খানিকটা লেগে গিয়েছিল। দাদার ডাকে তাড়তাড়ি উঠে দূরে তাকিয়ে দেখলাম সেই চেনা সূর্য মন্দির, কোনারকের চূড়া। লম্বা লাইনের টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। ওই দিকে যার মন্দিরে আসা সে ডুবতে শুরু করে দিয়েছে। ছবি তোলা শুরু করলাম । না না রাজ্যের না না লোক। তাদের ভাষা আলাদা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। কেউ কেউ মন্দিরের শিল্পকলা দেখে এতই মোহিত যে এখানে আসার প্রমাণস্বরূপ এক প্রস্তর হস্তীর ঘাড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ছবি তুলতে উদ্যত হলেন। শেষে গার্ডের চিৎকারে হাতিটা কে কিছুটা রেহাই দিয়ে ওটার উপর বসে ছবি তুললেন। কেউ বা মন্দিরের দেওয়ালের সামনের লোহার বেড়া অবজ্ঞা করে ভেতরে ঢুকে সেল্ফি নিলেন। গার্ড আছে, সিকুরিটি আছে তবুও মানুষের এই রকম শিল্প প্রেম। বছর পাঁচেক আগেও গিয়েছিলাম কোনারকে। তখন এতটা খারাপ অবস্থা ছিল না। মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্য আজ পাঁচ বছর অনেকটাই ম্লান। প্রকৃতির ক্ষয় তো থাকবেই, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশী ক্ষতি করছি আমরা। আমাদের পরবর্তী জেনারেশন কোনারকের যে রূপ দেখবে তা ভাবলে আমার খারাপ লাগে। কেউ বা দূরে চুপ করে বসে থেকে দেখছেন চতুর্দশীর চাঁদে কোনারক এর মায়াবী রূপ। কত ইতিহাস, কত কথা-রূপকথা জড়িয়ে আছে এই মন্দিরের সাথে। তবে যাই হোক না কেন কোনারক আজও মাতাল করে ওর রূপের পরশে। ফেরার পালা। কোনারক থেকে ফেরার পথে চন্দ্রভাগাতে দেখলাম ওড়িশি নাচের এক অনুষ্ঠান। এর আগে কখনো ওড়িশি নাচ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। ওনাদের উপস্থাপনা আর এক্সপ্রেসন মুগ্ধ করল, নিস্তব্ধ করল। তা নিয়েই চললাম অন্ধকার পথ পেরিয়ে হোটেলের দিকে। আজকের মত এখানেই শেষ যাত্রা।





পরের দিন উঠতে একটু দেরি হল। সকালের টিফিন সেরে বেরিয়ে পড়লাম মন্দিরের দিকে। আজ রাস পূর্ণিমা তাই হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে একবার অনন্ত জগন্নাথ দর্শনের জন্যে। শুনলাম ভোর ৩.৩০-৪ টে থেকে সবাই লাইনে। মন বলল-
"একবার জগন্নাথকে দেখ চেয়ে...."
মন্দিরের বাইরেই জগন্নাথ দেখা হল আমার। এত মানুষ সবাই বাইরের দিক থেকে আলাদা হলেও ভেতরে যেন একজন অপর জনের হাতে হাত ধরে আছে। একজন আর একজনকে না চিনলেও নিজেদের সাথে ওরা সংযুক্ত। সেই সংযোগের সুতো হল ভক্তি আর বিশ্বাস। ফেরার সময় হয়ে এলো। তাই মনটা খুব একটা ভালো নেই। তবুও মনে মনে ভাবলাম এক শেষ থেকেই তো হবে এক নতুনের শুরু। মানুষের নিজের মধ্যেই আছে সেই নতুনের খোঁজ। নিজের মধ্যেই আছে সেই পরম সৌন্দর্যের রূপকার।

No comments:

Post a Comment