তাড়াতাড়ি সব সেরে আপিস থেকে যখন বেরোলাম তখন প্রায় বিকাল ৫.৪৫। হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়বে ৮ টা, বিভূতি এক্সপ্রেস। যাচ্ছি দূর্গাপুর সেখান থেকে গন্তব্য কেন্দুলি। কাল মকর সংক্রান্তি। শুনেছি নাকি কোনো এক এই মকর সংক্রান্তির দিনই কবি জয়দেব গঙ্গাকে অজয়ের বুকে বরণ করেছিলেন ব্রাহ্মক্ষনে। সেই দিনকে উদ্দেশ্য করেই প্রতি মকর সংক্রান্তির দিন হয় মেলা। যাচ্ছি সেই মেলা দেখতে, জয়দেব-কেন্দুলির মেলা। শুধুই কি মেলা দেখতে যাচ্ছি? সত্যি বলতে এর উত্তর আমারও জানা নেই। মনে মনে মেলা দেখার থেকে মানুষ দেখার উৎসাহ বেশী। শুনেছি কাতারে কাতারে মানুষ আসেন না না জায়গা থেকে। কেন আসে জানি না। কিছুটা সেই উত্তর পাওয়ার আশায় যাচ্ছি। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছাতে লেট হল আর কি করা, বিভূতি আমাদের ছেড়ে গেল। সাথে দুর্গাপুরের জেনারেলের টিকিট, উঠে পড়লাম হাওরা-রাজেন্দ্রনগর পাটনা এক্সপ্রেসে। জেনারেল ওঠার জায়গা পেলাম না, তাই উঠে পড়লাম স্লিপারে। অপরাধীর মত ব্যাগ পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মাঝে মাঝে টি. টি. ই. আর রেল পুলিশের প্রশ্ন বাণ-
-কোথায় যাবেন? টিকিট কোথায়? এই টিকিটে এখানে কেন?
আমাদের খারাপ পরিস্থিতির কথা বললাম। ফের প্রশ্ন-
-কি করতে দূর্গাপুর?
-মেলা দেখতে।
-কোন মেলা?
-কেন্দুলির মেলা।
-ও আচ্ছা জয়দেবের মেলা।
কথা শুনে বুঝলাম কিছুটা দয়া হয়েছে ওনাদের। ২.৩০ ঘন্টার মধ্যে ট্রেন পৌছালো দূর্গাপুর রেল স্টেশান। জিজ্ঞাসা করে পৌছালাম বাস স্ট্যান্ডে। স্ট্যান্ডের এক দিকে পর পর বাস দাঁড়িয়ে। মাইকে ঘোষণা-
"কেউ বাসে দাঁড়িয়ে যাবেন না। আমাদের অনেক বাস আছে। বসে যাবেন। বাসের ভাড়া ৩০ টাকা, বেশি দেবেন না।"
আর এক দিকে লাইন দিয়ে পর পর হোটেল। আগে পেটের জ্বালা মেটাতে হবে। তাই ঢুকলাম "জয় মা তাঁরা" হোটেলে। ঢুকতেই হোটেলের এক কর্মচারী বলল "এই এখানে ভাত নাগাও।" ভাত খেয়ে বাসে উঠলাম। শুনলাম ৪০ মিনিটের পথ। বাসে যারা বসে সবার গন্তব্য একই, জয়দেব কেন্দুলি।
বাস নামালো অজয়ের এক পারে। সেখান থেকে কিছুটা হেঁটে বালি দিয়ে তৈরী অস্থায়ী ব্রিজ পেরিয়ে আসলাম মেলা প্রাঙ্গনে। কিন্তু এইটাই কি সেই জেয়দেবের মেলা যার জন্যে আসা, নাকি কোনো মাল্টি ডিস্কো ইভেন্ট! চার দিকে মাইক, সাধারণ মাইক না। বড় বড় বক্সের আওয়াজ। যেন একজন performer আর একজনের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। যেই দল যত বড় তাঁবুতে তার তত বড় performance এর মঞ্চ। বিয়ে বাড়ির মত জাঁকালো ভাবে LED দিয়ে সাজানো তাঁবুর ভেতর। কিছু কিছু তাঁবুতে live performance ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতক্ষণ তো বিকৃত বাউল ও ধর্মপ্রাণ গান শুনছিলাম। এখন আবার "ইয়াদ আ রাহা হে তেরা পেয়ার..." ও কানে আসল। সব মিলিয়ে সে এক জগা খিচুড়ি অবস্থা আর কি। পেছনে ফেলে হাঁটলাম আরো দেখতে। সব তাঁবুতে একটা জিনিসে মিল আছে। সব তাঁবুতেই অসংখ্য পুণ্যার্থী আশ্রয় নিয়ে আছেন। মাটিতে খড় বিছিয়ে তার ওপর একটা প্লাষ্টিক পাতা। তার ওপর কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বসে আছেন, কেউ বা নিজের মনে নাম জপছেন। কোনো কোনো তাঁবুর ভেতরে যজ্ঞ হচ্ছে, শঙ্খ বাজছে। চললাম জয়দেবের মন্দির দেখতে।
শোনা যায় যে বর্তমান মন্দিরটি ১৬১৪ সালে কবি জয়দেবের বাড়ির জায়গার ওপর তৈরী করা হয় ও সেটা বর্ধমানের রাজা কীর্তিচন্দ্রের মা ব্রজকিশোরী দেবীর ইচ্ছাতে তৈরী হয়। ৯ চালা মন্দির। মন্দিরে সুন্দর টেরাকোটার কাজ। কাজের মধ্যে দিয়ে রামায়ণ, বিষ্ণু অবতারের না না কাহিনী বর্ণিত। যদিও বেশ কিছু কাজ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে, মেরামতও হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে রাধামাধবের মুর্তি। তার এক পাশে জয়দেব আর এক পাশে পদ্মাবতী। যথাসম্ভব ছবি তুললাম মন্দিরের, ভগবানের আর ভক্তের।
আবার ঘুরতে লাগলাম এই আখড়া, ওই আখড়া। ঠান্ডা তখন হাড় কাঁপাচ্ছে, যেখানেই আগুন জ্বালানো দেখছি দাঁড়িয়ে পড়ছি কিছুক্ষণ জন্যে। তখন প্রায় রাত ৩.৩০, মেলার প্রায় শেষ প্রান্তে এসে গেছি। এই দিকটা মাইকের জ্বালাতন অনেকটাই কম, তাই কিছুটা শান্তি। হঠাৎ কানে ভেসে আসল হালকা করতালের আওয়াজ। কোথাও একটা করতাল বাজছে আর তার সাথে সাথে একটা কণ্ঠস্বর। কিন্তু কোথায় হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর বুজলাম একটা ছোট্ট তাঁবুর ভেতর থেকে শব্দটা আসছে। বাইরে বসে কিছুক্ষণ ওনাদের গান শুনলাম। গান শেষ হলে অনুমতি নিয়ে ভিতরে গেলাম, গান শুনলাম আরো কিছু। মনে হল এটাই হয়তো খুঁজত এসেছিলাম। এই বিশ্বাস, এই ভক্তি যার কোনো আড়ম্বর নেই, যার বাহ্যিক লোক দেখানো নেই। যা আছে শুধুমাত্র মানুষের মনের খুব ভেতরে, নিজের অজান্তে, অগোচরে। হিসাবি মন ঘড়ি দেখে বলে হাতে বেশী সময় নেই, এবার যেতে হবে। অনুমতি নিয়ে বেরোলাম তাঁবুর থেকে। আশীর্বাদ দিলেন "তোমাদের তাড়াতাড়ি কৃষ্ণজ্ঞান হোক"... গেয়ে শোনালেন ধর্মের সার কথা, "জীবে দয়া কৃষ্ণ নাম সর্বধর্ম সার"।
অজয়ের ঘাটের সামনে যেতে হবে, দেখতে হবে বিশ্বাসের আর এক ধাপ। কথিত আছে নাকি ভক্ত জয়দেব রোজ সকালে কাটোয়াতে গিয়ে গঙ্গাস্নান করে এসে রাধামাধবের পুজো দিতেন। একদিন রাধামাধব ভক্তকে স্বপ্ন দেখান যে রোজ রোজ স্নানের জন্যে কাটোয়া আসতে হবে না, বরং ভগবান নিজেই বছরে এক দিন যাবেন অজয়ের মধ্যে। মকর সংক্রান্তির ব্রাহ্মমুহূর্তে একটা পদ্মফুল ভেসে যাবে অজয়ের বুকে, তা থেকে বোঝা যাবে যে ভগবান এসেছেন। সেই মকর সংক্রান্তির স্নান চলছে এখনও। সারা বাংলা থেকে অসংখ্য মানুষ এসেছে এই স্নানের জন্যে। কোনো যুক্তিবাদী প্রশ্ন না, শুধু বিশ্বাস। এই বিশ্বাস একমাত্র দেখা যায় আমাদের দেশে। সবাই মিলে এক সাথে একটা বিশ্বাসে আস্থা কোনো রকম প্রশ্ন না কোনো রকম যুক্তি না। প্রশ্ন আর যুক্তির বুনন থেকে এই বিশ্বাস মুক্ত। আকাশের এক দিকে ভোরের চাঁদ অন্য এক দিকও লাল হয়ে আসছে ঊষার আভাষে আর মাঝে অজয়ের বুকে হাজার হাজার বিশ্বাস।













No comments:
Post a Comment