মন ঘরে না থাকার রোগটা লেগেছে আজ বেশ কিছু দিন হলো। বেরিয়ে পড়ি এখানে ওখানে, কিসের খোঁজে জানি না। জানার কিই বা দরকার। মনের বেরোনোর ডাক আগে থামাতে পারতাম, এখন আস্তে আস্তে সে ক্ষমতা কমছে। তাই উপায় নেই, ডাক দিলেই "চলো মন রূপনগরে"। চলতে গেলে বাধা কি আসে না? তা আসে বইকি, তা সে বাধার বাঁধ টেনে বেরিয়ে পড়া বন্ধুদের নিয়ে। কৃষ্ণনগর রেল স্টেশনে যখন নামলাম তখন বেলা ১২.৩০। এবারের গন্তব্য আরো ৬৫ কি.মি. দূরে, গোরভাঙা, মনসুর ফকিরের আশ্রম। ফকিরজির আশ্রমে যখন পৌছালাম তখন বেলা ২.৩০ বা ৩ টে হবে। আমাদের দেখে ফকির আসলেন বাড়ীর থেকে, সাথে ৪-৫ টা ক্ষুদে ফকিরকে ঘিরে। দীর্ঘদেহী ফকিরের উচ্চতা ৬ ফুট ২ ইঞ্চির কাছাকাছি। চেহারার গঠন যেমন দৃঢ়, মুখে তেমিনই সারল্য। চোখ দুটো উজ্জ্বল, দাড়ি ভরা মুখে শিশুর হাসি। এর আগে কথা হয়েছে মাত্র একবার তাও ফোনে, অথচ যেন কতো দিনের চেনা মানুষ আমরা, কাছের মানুষ আমরা। আমাদের সবাইকে নিয়ে বসালেন আশ্রমের মূল ঘরে, যেখানে তাঁর বাবা আজাহার ফকিরের সমাধি। কত কথা, মনের সাথে মনের কথা। বললেন "বাবা এই দাওয়ায় বসে যে গান হয় তা অন্য কোনো মঞ্চে হয় না।" চললো দোতারার বৈঠার সাথে গানের ভেলা। সে ভেলায় চড়লাম আমরাও, বয়ে চললাম বহু দূর। ৫.৩০ টা পর্যন্ত চললো আমাদের আসর। তার পর ফকিরজির ঠিক করা গাড়ি করে চললাম পাশের গাঁয়ে, আজ ভবা ক্ষেপার জন্মতিথি উপলক্ষে ফকিরজির অনুষ্ঠান ওই গাঁয়ে। সারা সন্ধ্যা শুনলাম তাঁর গান। সে গান কানের ভেতর ঢুকে প্রাণকে স্পর্শ করে। ওই গ্রামের মানুষের আতিথেয়তায় ভরে গেলো মন। সেই আতিথেয়তা আমাদের মতো শহুরে নয়, সে আতিথেয়তা অনেক বেশি মনের কাছের। মানুষের মধ্যে এত সারল্য আর নিবিড়তা অনেক দিন পর প্রত্যক্ষ করলাম, যা আমরা ভুলেই যাচ্ছি দিন দিন । সন্ধেবেলার টিফিনের থেকে শুরু করে রাতের "সেবা"(খাওয়া দাওযা) পর্যন্ত কিছুই বাদ গেলো না সেই আতিথেয়তায়।
ফকিরজির সাথে আশ্রমে যখন ফিরলাম তখন প্রায় রাত ১২.৩০। আশ্চর্য ব্যাপার মানুষটার মধ্যে নেই কোনো ক্লান্তি, নেই বিরক্তি। ১টা নাগাদ আবার দোতারা চাইলেন, আমাদের নিয়ে বসলেন সেই আশ্রমের দাওয়ায়, শুরু হলো গান। বাইরে আকাশে তখন মেঘের ঝিলিক আর মনের আকাশে ভারী বর্ষণ।
পরের দিন সকালে ফিরতে হবে উপায় নেই। আবার সেই হিসাব নিকাশের জীবনে বাধা পড়তে হবে। সকালে সবাই যখন ওনাকে প্রনাম করে গাড়িতে উঠলাম তখন প্রায় সবার চোখের কোনে উজ্জ্বল মুক্ত জ্বলছে। দেখলাম ফকির সাহেব তাকাতে পারলেন না আমাদের গাড়ির দিকে, হাত জোড় করে তাকিয়ে আছেন অন্য দিকে। চলে তো আসলাম কিন্তু মনের যা অবস্থা দেখছি আবার যেতে হবে খুব শিগগিরি।




No comments:
Post a Comment