![]() |
| কালাচাঁদ দরবেশ |
শুভ্র বসন পরি যায় দরবেশ
সাজিয়া আপন সাজে,
দেখেছি তাহারে আপন নয়নে
হৃদয় আঙিনা মাঝে।
ধূপগুড়ি রেল স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের টোটো পথ ২ নম্বর ব্রীজ। তার পাশেই নেমে গেছে একটা সুন্দর ছোট্ট গ্রাম, রাধানগর। সেখানেই থাকেন এক দরবেশ। ইটের তৈরি দোচালা ছোট্ট বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট উঠোন। একসময় এই উঠোনের বসতো দরবেশী গানের আসর, আসতো অনেক দূর থেকে অনেক ছাত্র, অনেক ভক্ত। আজ সে সব অতীত। সেই সব স্মৃতি যেন বয়ে নিয়ে চলেছে উঠোনের পাশের জীর্ণ তুলসী মঞ্চটা।
ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে শীর্ণ এক কণ্ঠস্বরের গান। ঘরে ঢুকে খাটে যাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম তিনিই কালাচাঁদ দরবেশ, বাংলার বিশুদ্ধ দরবেশী ধারার একমাত্র জীবিত স্রোত। যাওয়ার কথা আগে থেকেই ওনার ছেলেকে জানানো ছিলো, তাই ওনার ছেলেই পরিচয় করিয়ে দিলেন দরবেশজির সাথে। এক চোখে দেখতে পান না, আর একটাতে আবছা দৃষ্টি। হাতটা ধরে নিজের বুকের কাছে নিয়ে বললেন "তোমাকে তো দেখতে পারছিনা বাবা, তাই হাতটা ধরলাম।"
পূর্ববঙ্গ থেকে বেশকিছু সহজিয়া ধারা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্ত। নানান কারণে একরকম বাধ্য হয়েই তাঁদের চলে আসতে হয় এই দিকে। তেমনই ১৯৬৪ তে কালাচাঁদ দরবেশ পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসেন এই বাংলায়, তার পর থেকে এই গ্রামেই বাস। প্রথম জীবনে জলপাইগুড়ি আনন্দ চন্দ্র কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পূর্ণ করার পর ধুপগুড়ির এক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার পর সব ছেড়ে বাবার কথায় এই পথ বেছে নেওয়া। শিক্ষামন্ত্র নিলেন রাধচরণ দরবেশের কাছ থেকে। স্বরাজ(ওনার বাজানোর সাত তারের যন্ত্রটি) শিখলেন মদন মোহন দেবনাথের কাছ থেকে। সেই থেকে এক ভিন্ন পথের পথিক।
ট্রেনে মাধুকরী করে জীবনযাপন করতেন এক সময়। এখন আর স্বরাজ বাজাতে পারেন না, শারীরিক দুর্বলতার কারণে। শরীর চলে শরীরের মতো তাতে কি হয়েছে সে তো মনের আনন্দ হরণ করতে পারে না। শোনালেন অনেক গান। সেই গানে ওনার এত বড় জীবন সাগরের বারিবিন্দু পেলাম।
"হৃদয় কপাট দেখ না খুলে
ঘরের মানুষ ঘরেই খাঁড়া।
মন তোর চর্মচক্ষু বন্ধ না হইলে
খুলবে কি সেই জ্ঞানের তারা।
আছে মানুষ এই নিজ স্বরূপে
খেলা করে চুপে চুপে,
ডুব দিয়ে দেখ রসের কূপে,
দেখতে পারবি তার চেহারা।"
তোমার মধ্যে কে কথা কয়, আগে তারে চেনো। আর কিছু দরকার নেই। বাবা, বাউল-ফকির-দরবেশ যাই বল পৌঁছানোর জায়গা একটাই। সাগরের জিনিস সাগরে আছ, সেই সাগর থেকে উদ্ধার করতে হবে।"
ওঁনার গায়েকি ও ওঁনার গাওয়া গানগুলো প্রথাগত বাউলগান ও ফকিরি গানের থেকে বেশ অনেকটা আলাদা। উনি নিজেও অনেক গান লিখেছেন সুরও দিয়েছেন। একবার দিল্লির এক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন ওনার বাড়ি ডুয়ার্সে থাকার জন্যে ওনাকে গাছ নিয়ে একটা গান বাঁধতে বলা হয়। তখন তিনি একটি গাছ নিয়ে গান লেখেন-
"এই গাছের বংশ করিলে ধ্বংস
প্রকৃতির কাছে কারোর নিস্তার নাই।
গাছ লাগাইয়া সম্পদ বাড়াও ওরে আমার মানুষ ভাই।
যেমন একটি গাছের একটি প্রাণ, বিশ্ব পিতার তারাও সন্তান,
এই গাছ না থাকলে বিশ্ব হইত শ্মশান।"
যেখানে সত্য সেখানে ধর্ম ও সেখানেই ভগবান- এই কথা আবারও শুনলাম ওনার থেকে। একটা জিনিস বুঝলাম যে, কেন এক ধরেনের লোকগুলো আমাদের তথা কথিত "সমাজ" থেকে দূরে সরে থাকতে চান।
-"সবাই পালায় বাবা, থাকতে পারে না এখানে। সব ছেড়ে জঙ্গলে পালায়। এখন শুদ্ধের মধ্যে অনেক অশুদ্ধি এসে গেছে।
মরি হায় রে,
হবে কি আর বাইরের শুদ্ধ সাজ দিলে।
এই অন্তর যদি না সাজাও ভাই,
তবে রসরাজকে কোই মিলে?
বাহিরে সাধকের লক্ষণ, মনটি অসুরের মতন।
যেমন সাধু সেজে সিতা চুরি করিল রাবণ।"
সত্যিই গানটা যেন বর্তমান সামাজের জন্যে উপযুক্ত। কাকে ঠকাচ্ছি আমরা? হয়তো কাউকেই না, নিজেকেই।
খুব সামান্য কিছুক্ষনের আলাপ সত্ত্বেত্ত তা ভুলে গেলাম ওনার আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাতে। চোখে না দেখেতে পেরেও হয়তো মনের ভেতরে প্রবেশের রাস্তাটা খুব ভালোভাবে চেনেন উনি। মনটা খারাপ হল কারণ ফিরতে হবে। বেরনোর কথা বলতেই বললেন- "এমন ভাবে তো যেতে দেবনা। দরবেশের বাড়ি এসেছ বাবা না খেয়ে চলে যাবে? তা কি হয় কখনো। দুটো ভাত খেয়ে যাও।" ইতিমধ্যে ভাত হাজির, ওনার পরিবার পাশে বসিয়ে খাওয়ালেন। মানুষগুলোর চোখের সারল্য মুগ্ধ করল। এই সারল্যই হয়তো সামান্য এই সময়ের মধ্যেই এতটা আপন করে নিয়েছে।
হাতে বাঁধা সময় আর এই সময়ের হাতেই বাঁধা আমরা। তাই এবার বিদায় নেওয়ার পালা। বিদায় নিয়ে
- তবে আসি। আসব আবার।
- কবে আসবা?
- আবার অন্য একদিন আসব।
- সেই 'অন্য একদিনটা' কত দিন পর?
এই প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না তাই দিতে পারলাম না। বললেন "খবর নিও, মাঝে মাঝে খবর নিও।" প্রণাম করে বেরলাম ঘর থেকে, আর পেছনে তাকাতে পারলাম না।
![]() |
| কালাচাঁদ দরবেশ |
![]() |
| স্ত্রীর সাথে কালাচাঁদ দরবেশ |



No comments:
Post a Comment